
পাবনা বিটিসিএলের সহকারী ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এর পাবনা জেলা অফিস কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অফিসে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকেন না; নতুন সংযোগে অনিহা, বিল জটিলতা আর লাইনের ত্রুটিতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। অফিসে যোগাযোগ করতে গেলে অনেক সময় দেখা যায়, কর্মকর্তারা ‘বাইরে’ বা ‘মিটিংয়ে’ আছেন; এমন অজুহাতে এড়িয়ে যান সেবা প্রার্থীদের।
বিটিসিএল পাবনা অফিসে উপ-মহাব্যবস্থাপক না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন সিরাজগঞ্জ বিটিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মানুন। কিন্তু তিনি অফিসে আসেন না বললেই চলে, প্রায় এক সপ্তাহ যাবৎ অফিসে পাওয়া যায়নি। এর ফলে দায়িত্বে আছেন সহকারী ব্যবস্থাপক (টেলিকম-১) মো. জাহিদ হাসান। তিনি একক ও অদ্বিতীয় ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়ম করে আসছেন।
অফিসে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, সহকারী ব্যবস্থাপক নিজের ইচ্ছামতো অফিস পরিচালনা করেন এবং তিনি স্থানীয় হওয়ায় কেউ তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারেন না। কিছু বললেই বদলি ও নানা হয়রানির হুমকি প্রদান করেন; ফলে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেন না।
এসব বিষয়ে সহকারী ব্যবস্থাপক মো. জাহিদ হাসান সাংবাদিকদের তথ্য না দিয়ে অশালীন আচরণ করেন। সাংবাদিকদের ‘ভিউ ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়ে এক পর্যায়ে বলেন, “যা পারেন করেন, আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। আপনাদের জানা আছে, নিউজ করে কিছুই করতে পারবেন না। আর বিটিসিএল এখন কেউ ব্যবহারই করে না।”
গ্রাহক ও স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, বিটিসিএল অফিসে তথ্য নিতে গেলে কর্মকর্তারা তাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণ করেন। অনেক সময় বলা হয়, “এখন বিটিসিএলের চাহিদা নাই, তাই কাজও নাই।”
তবে প্রশ্ন উঠেছে, চাহিদা না থাকলে এত অফিস, কর্মকর্তা, গাড়ি, বেতন-ভাতা ও বাজেট কেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি কর্মকর্তারা।
ইন্টারনেট বা ল্যান্ডফোন বিকল হলে মেরামতে লাগে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। অভিযোগ করেও সমাধান পাওয়া যায় না।
একজন ক্ষুব্ধ গ্রাহক বলেন, “বিল ঠিকভাবে দিই, কিন্তু লাইন ঠিক হয় না। অভিযোগ দিলে বলে, ঢাকায় কথা বলেন।” এভাবে জনগণের টাকায় অফিস চলে, কিন্তু সেবা মেলে না।
বিটিসিএল প্রতি বছর কোটি টাকার বেশি সরকারি বরাদ্দ পায়। অফিস পরিচালনা, সরঞ্জাম ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ ও বেতনের জন্য। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি নেই। পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়েই চলছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিটিসিএল এখনো পুরনো কপার লাইনেই আটকে আছে। বাজেটের বেশিরভাগ অংশ প্রশাসনিক খরচে ব্যয় হচ্ছে, সেবার মানোন্নয়নে নয়।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, অফিসে উপস্থিতি মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধের অভাব ও তদবিরনির্ভর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানটিকে আরও অচল করে তুলেছে।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা বলেন, “উপরের নির্দেশ ছাড়া কোনো বড় কাজ হয় না। অনেকেই দায়িত্বহীন হয়ে পড়েছেন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিটিসিএলকে টিকিয়ে রাখতে চাইলে এখনই কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। তাদের পরামর্শ, অফিসে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি মনিটরিং বাধ্যতামূলক করা, অনলাইন অভিযোগ ও বিল ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং প্রযুক্তি আধুনিকীকরণে বাজেট পুনর্বিন্যাস করা। অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেবার মানোন্নয়ন করতে হবে। তা না হলে বছরের পর বছর এমন লোকসান গুনতে হবে এই দপ্তরকে।
জনগণের টাকায় পরিচালিত এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বর্তমান চিত্র হতাশাজনক। অদক্ষতা, দায়িত্বহীনতা ও প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতায় হারিয়ে যাচ্ছে আস্থা। সরকার যদি দ্রুত উদ্যোগ না নেয়, তাহলে বিটিসিএল কেবল কাগজে-কলমেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।