
সংগৃহীত ছবি
পান একসময় ছিল বাংলার আতিথেয়তা, সৌজন্য আর ঐতিহ্যের প্রতীক। সেই ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বাতাকান্দি বাজারের পান বিক্রেতা মো. মোবারক হোসেন মাইজ ভান্ডারী (৭০)। টানা ৫৫ বছর ধরে প্রায় ৩০ ধরনের মসলা দিয়ে তৈরি সুস্বাদু খিলি পান বিক্রি করে তিনি কেবল জীবিকা অর্জনই করেননি, বরং গড়েছেন একটি পরিচিত ব্র্যান্ড মোবারক ভাইয়ের পান।
মোবারক হোসেন উপজেলার বাতাকান্দি গ্রামের মরহুম কলমুদ্দিন শাহের ছেলে। পিতার মতো তিনিও আধ্যাত্মিক তরিকার অনুসারী। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে বাতাকান্দি পূর্ব বাজারে প্রথম পান বিক্রির দোকান দেন তিনি। সেখান থেকে টানা ১৫ বছর ব্যবসা করে পরে দোকানটি স্থানান্তর করেন বাতাকান্দি গরুবাজার সংলগ্ন স্থানে। সেই জায়গাতেই গত ৪০ বছর ধরে অবিচলভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন তার পান ব্যবসা।
তার হাতে বানানো পান খেতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় করেন পানপ্রেমীরা। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলে দোকান। সাদামাটা দোকান হলেও সাজানো থাকে বিভিন্ন উপাদান- জাফরান, চুন, সুপারি, এলাচ, লবঙ্গ, কেমনো, রূপ-সুপারি, মেহেদি, সুগন্ধি তামাক, কাজুবাদাম গুঁড়া, কেশরসহ নানা আকর্ষণীয় মসলা। এগুলো নিয়েই তিনি তৈরি করেন তার বিখ্যাত ৩০ মসলার খিলি পান।
ব্যক্তিজীবনে তিন ছেলে ও দুই মেয়ের জনক মোবারক হোসেন খিলি পান বিক্রি করেই সংসার চালিয়েছেন। তার আয় দিয়েই তিনি তিন ছেলেকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছেন। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন শুধুই নিজের সততা ও পরিশ্রমের পথ ধরে।
মোবারক হোসেন বলেন, পান বিক্রিই আমার জীবনের গর্ব। এই দোকানই আমার ভরসা, আমার সম্মান।
স্থানীয় অধিবাসীরা তার পানের ভক্ত। নিয়মিত ক্রেতা নূরুল ইসলাম বলেন, মোবারক ভাইয়ের পানের স্বাদ ভোলার নয়, মসলার ঘ্রাণই আলাদা।
বাতাকান্দির সাপ্তাহিক পশুর হাটে আসা মোবারক নামে এক গরু ব্যবসায়ী বলেন, হাটে এলেই তার দোকানে না গিয়ে পারি না, এমন পান আর কোথাও মেলে না।
বৃদ্ধ ক্রেতা আবদুল করিম মিয়া বলেন, ৩০ বছর ধরে তার পান খাচ্ছি। স্বাদ যেমন ছিল, রাখা-ধরা ব্যবহারে এখনো তেমনই। মানুষটা অমায়িক, সৎ।
অত্যন্ত ভদ্রস্বভাব, দয়ালু ও সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত মোবারক হোসেন এলাকার মানুষের কাছে সম্মানীয় ব্যক্তি। তার দোকানে এলে কেউ খালি মনে ফিরে যান না, হাসিমুখে পান পরিবেশন আর আন্তরিক আচরণে জয় করে নেন সবার মন।
খিলি পান বিক্রির মতো উপেক্ষিত একটি পেশাকে সম্মান, আন্তরিকতা ও ঐতিহ্যের মর্যাদায় ৫৫ বছর ধরে ধরে রেখেছেন মোবারক হোসেন। তিনি শুধু একজন পান বিক্রেতা নন, তিনি এক প্রেরণা, এক জীবন্ত ইতিহাস।
স্বদেশ প্রতিদিন/শাহো