
রংপুর জেলার পীরগাছার পর এবার মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলাতেও অ্যানথ্রাক্স উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও আইইডিসিআরের (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সংক্রমণের উৎস অসুস্থ গরু ও ছাগলের মাংস।
গত জুলাই ও সেপ্টেম্বরে পীরগাছায় দুজন ব্যক্তি মারা গেছেন, যাদের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া গেছে। যদিও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর কারণ অ্যানথ্রাক্স সরাসরি নয়। এ সময় প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফ্রিজে রাখা গরুর মাংস ও ছাগলের মাংসের নমুনা পরীক্ষায় অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। আইইডিসিআর গত ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর পীরগাছা থেকে ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে, যার মধ্যে আটজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স নিশ্চিত হয়।
রংপুর বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি গরু-ছাগল জবাই করা হয়। অথচ এসব পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় না। বিভাগের ১ হাজার ৩০৩ টি হাট-বাজারে কোথাও নেই আধুনিক কসাইখানা বা পর্যাপ্ত ভেটেরিনারি চিকিৎসক।
আইন অনুযায়ী, পশু জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মাংস বিক্রির জন্য লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও, বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। অধিকাংশ মাংস ব্যবসায়ীর কাছে প্রয়োজনীয় সনদ নেই, অনেকে নিয়মের কথাই জানেন না।
পীরগাছার পাশাপাশি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও রংপুরের তারাগঞ্জেও একই ধরনের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। সুন্দরগঞ্জে দৈনিক ৬০-৬৫টি পশু জবাই হয় প্রায় ৩০টি স্থানে, কিন্তু কোথাও নিয়মিত পশু পরীক্ষা হয় না।
সুন্দরগঞ্জের বাজার ইজারাদার মো. শুকুর আলী বলেন, ‘আমাদের পৌরসভায় নিয়মিত পরীক্ষা হয়, কিন্তু অন্য বাজারগুলোতে এটা হয় না। রামগঞ্জ বাজারে অসুস্থ গরু জবাই হয় বেশি, যেগুলোর মাংস পাইকারিভাবে সরবরাহ করা হয়।’
তারাগঞ্জের এক মাংস ব্যবসায়ী বলেন, ‘মাংস ব্যবসার জন্য প্রাণিসম্পদ থেকে লাইসেন্স নিতে হয় এটা জানতাম না। কয়েক দিন আগে মিটিংয়ে শুনেছি। এখন নিব। আমরা অসুস্থ পশু জবাই করি না। ওই জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা করি না। শেড দখলে তাই গরু বাইরে জবাই করি।’
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন,‘ অ্যানথ্রাক্স মানুষের শরীরে সবচেয়ে বেশি ছড়ায় আক্রান্ত পশুর মাংস, রক্ত, শ্লেষ্মা ও হাড়ের সংস্পর্শে এলে। তবে এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে সাধারণত চামড়ায় কালো ঘা দেখা দেয়।’
পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তানভীর হাসনাত জানিয়েছেন, বর্তমানে আক্রান্তদের চিকিৎসা চলছে, এবং বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আক্রান্ত এলাকায় মেডিকেল টিম পাঠানো হয়েছে, এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক মজুদ আছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু ছাইদ বলেন, ‘জেলায় ১৩ লাখের বেশি গবাদিপশু রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬৫ হাজার গরু-ছাগলকে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে সচেতনতা জরুরি।’
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. আব্দুর হাই সরকার বলেন, ‘আমরা হাট-বাজারে স্বেচ্ছাসেবী ও চিকিৎসকদের মাধ্যমে পশু পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা করছি। তবে জনবল সংকট বড় সমস্যা।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম