
যশোরের কেশবপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে কৃষকের অগোচরে প্রাকৃতিক জল শোধনকারী ‘ফিল্টার’ প্রাণী শামুক নিধন করা হচ্ছে নির্বিচারে। এর ফলে মৎস্য ও কৃষি বিভাগ চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পরিবেশবিদরা মনে করছেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়বে।
ভবদহ অঞ্চলের কেশবপুর উপজেলায় ৫৫ হাজার ৮৬৭ বিঘা জমিতে ৪ হাজার ৬৫৮টি ঘের এবং ৫ হাজার ৮৮৭ বিঘায় ৬ হাজার ৯৯৫টি পুকুর ও দিঘি রয়েছে। মনিরামপুর উপজেলায় ৬৮ হাজার ৬১০ বিঘায় ৪ হাজার ৮৮৯টি ঘের এবং ৩৪ হাজার ২৩৭ বিঘায় রয়েছে ১১ হাজার ৬৪৩টি পুকুর ও দিঘি। অভয়নগর উপজেলায় ৩৪ হাজার ৪২৫ বিঘা জমিতে ১ হাজার ২০৫টি ঘের এবং ২৫ হাজার ৮৯০ বিঘায় ৪ হাজার ৮১০টি পুকুর ও দিঘি রয়েছে। এ ছাড়া এই তিন উপজেলায় রয়েছে বহু জলাবদ্ধ উন্মুক্ত বিল, যেগুলো ঘের হিসেবে ব্যবহার হয় না।
দরিদ্র নারী-পুরুষ ও শিশুরা এসব জলাশয় থেকে শামুক সংগ্রহ করে পাইকারদের কাছে ৭ থেকে ৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে। সকাল থেকেই বিভিন্ন পয়েন্টে ভ্যান, সাইকেল ও দাঁড়িপাল্লা নিয়ে বসে থাকে পাইকাররা।
এরা শামুক-ঝিনুক থেকে মাংস বের করে মাছের খাদ্য হিসেবে ঘের মালিকদের কাছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি করে। আবার খোলগুলো চুন তৈরির কারখানায় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বস্তায় বিক্রি হয়। চুন কারখানার মালিকরা পাইকারদের কাছে অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখে শামুক-ঝিনুক কেনার জন্য। মনিরামপুর উপজেলার গোপালপুরে দুটি এবং চেচুড়িয়ায় একটি চুন কারখানা রয়েছে।
আড়য়া গ্রামের ফাতেমা বেগম জানান, তাদের পরিবার প্রতিদিন এক থেকে দেড় মন শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করে ৭ থেকে ৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে। সাগরদত্তকাটি গ্রামের ব্যবসায়ী জয়দেব বলেন, জলাবদ্ধ বিল থেকে শামুক কিনে মাছের ঘেরে সরবরাহ করেন এবং প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৩৫ টাকা লাভ হয়।
চুন কারখানার মালিক সমিরন দাস জানান, তার তৈরি চুনের দুই-তৃতীয়াংশ ঘের মালিকদের কাছে ৫০ কেজি বস্তা প্রতি ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন। বাকি এক-তৃতীয়াংশ পান ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়।
ঘের মালিক আকবর হোসেন ও মোস্তাক হোসেন জানান, মাছ মোটা করতে এবং খাদ্য হিসেবে শামুক-ঝিনুক ব্যবহার করেন। এভাবে শামুক নিধনের ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবিদরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘শামুক মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। শামুক পচে গিয়ে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ সরবরাহ করে, যা ফসলের জন্য উপকারী।’
কেশবপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস বলেন, ‘শামুক হচ্ছে প্রাকৃতিক জল শোধনকারী। এটি দূষিত পানি থেকে খাদ্য গ্রহণ করে বিশুদ্ধ পানি পরিবেশে ফেরত দেয়। এর কারণে বিলের মাছ যেমন কই, শোল, শিং, কার্প জাতীয় মাছ এবং শামুকের ডিম খেয়ে বেঁচে থাকে। শামুক কমে গেলে পানি দূষিত হয়ে রোগজীবাণু বেড়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১২ সালের ১০ জুলাই প্রকাশিত সরকারি প্রজ্ঞাপনে শামুককে ‘বন্যপ্রাণী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই হিসেবে শামুক ধরা ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি উপজেলা সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করে প্রতিকার চাওয়া হবে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরকার মুহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন, ‘শামুক প্রকৃতির খাদ্য শৃঙ্খলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যারা শামুক নিধন করছে, তারা পরিবেশ ধ্বংস করছে। তবে দুঃখজনকভাবে মৎস্য আইনে শামুক নিধনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম