
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন একটি চূড়ান্ত প্রক্রিয়া নির্ধারণের দিকে এগোচ্ছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সনদের সাংবিধানিক ধারা কার্যকর করতে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ‘সংবিধান আদেশ’ জারি হতে পারে। তবে এই আদেশ কার্যকর হবে জনগণের চূড়ান্ত অনুমোদনের মাধ্যমে। এজন্য আগামী সংসদ নির্বাচনের দিনই একযোগে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব এসেছে।
সনদে মোট ৮৪টি ধারা অন্তর্ভুক্ত আছে। এর মধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত সরকার নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর করতে পারবে। তবে প্রায় ৩৪টি ধারা বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। এখানেই মূল মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। বিএনপি বলছে, সংসদ ছাড়া কোনো সংবিধান সংশোধন সম্ভব নয়, অন্যদিকে জামায়াত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সাংবিধানিক আদেশ বা গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে শুরুতে দুটি ভিন্ন প্রস্তাব ছিল—একটি গণভোট, অন্যটি সংবিধান আদেশ। পরে আলোচনার মাধ্যমে সমন্বিত প্রস্তাব এসেছে: সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা এবং একই দিনে গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন নেওয়া। এভাবেই সাংবিধানিক বৈধতা ও গণআস্থার সমন্বয় ঘটবে বলে তারা মনে করছেন।
রাজনৈতিক দলগুলো সনদ বাস্তবায়নের জন্য ছয় ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—আংশিক বা পূর্ণ সনদ নিয়ে গণভোট, রাষ্ট্রপতির বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ, গণপরিষদ নির্বাচন, সংসদকে সংবিধান সংস্কার সভায় রূপান্তর এবং সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ। প্রতিটি প্রস্তাবই বাস্তবায়নের ভিন্ন পথ নির্দেশ করে, তবে কমিশন দ্রুত একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে চায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠকে বলেছেন, সংসদীয় প্রক্রিয়া ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করেছেন, নির্বাচন অনিশ্চিত হলে ফ্যাসিবাদী শক্তি ও অসাংবিধানিক চক্র লাভবান হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দাবি আদায়ের জন্য রাজপথের বদলে আলোচনার টেবিলে আসার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি হলে জনগণ আবারও রাস্তায় নামবে। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্যই হলো আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায়। একই সুরে জামায়াতের আরেক নেতা হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মৌলিক কাঠামো সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের নেই, তাই সাংবিধানিক আদেশ বা গণভোটই সঠিক পথ।
কমিশনের লক্ষ্য দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। কারণ, প্রধান উপদেষ্টা শিগগির জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরতে তার আগে বা পরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কমিশনের মেয়াদ এক মাস বাড়ানো হলেও তারা দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে চলতে চায়।
সব মিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও কমিশন সমঝোতার পথ খুঁজছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, সংবিধান আদেশের মাধ্যমে সাংবিধানিক ধারা কার্যকর করা এবং গণভোটে জনগণের অনুমোদন নেওয়া সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে কিনা, সেটিই নির্ধারণ করবে আগামী নির্বাচন ও গণভোটের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ