
মো. সাইফুল্লাহ কবির নাহিদ
ক্রীড়া জগতে তায়কোয়ান্দোর নাম আজ নতুনভাবে উচ্চারিত হচ্ছে এক তরুণের সাফল্যের কারণে। নাম তার মো. সাইফুল্লাহ কবির নাহিদ। ঢাকায় বেড়ে ওঠা নাহিদ ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত তিনি মুগ্ধ হন তায়কোয়ান্দোর প্রতি। সেই আকর্ষণ থেকেই শুরু হয় তার যাত্রা, যা আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে।
জাতীয় পর্যায়ে একের পর এক সাফল্যের পর নাহিদ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে অর্জন করেছেন গৌরবময় মুহূর্ত। শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, তিনি এখন কোচ ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও সক্রিয়। ফেডারেশনের নেতৃত্বে যুক্ত হয়ে এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে তার দৃষ্টিভঙ্গি কেবল নিজের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতি নিবেদিত।
এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে তিনি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন নিজের ক্যারিয়ারে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাহিদ নিজের তায়কোয়ান্দো স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন, যেখানে তরুণদের প্রশিক্ষণ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে দেশের জন্য নতুন চ্যাম্পিয়ন তৈরি করতে চান। তার যাত্রা আজ প্রমাণ করে, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম দিয়ে বাংলাদেশও বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়েছে গৌরবঃনাহিদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্য ছিল ২০১৬ সালের ১২তম দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং দেশের জন্যও ছিল এক গর্বের অধ্যায়। এছাড়া তিনি কোরিয়া কাপ তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপ, কাঠমান্ডু ইন্টারন্যাশনাল তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপ, ভুটান ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপসহ নানা মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এরআগে, ২০১৪ সালে কোরিয়ান অ্যাম্বাসেডর কাপ তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেন। সেদিন থেকেই নাহিদ কেবল একজন খেলোয়াড় নন, বরং বাংলাদেশের তায়কোয়ান্দো ইতিহাসের এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক সাফল্যের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও নাহিদের উপস্থিতি ছিল দৃঢ়। তিনি কুক্কিওন কাপ, জাতীয় তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতা এবং ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেন।
নাহিদের মতে, এসব প্রতিযোগিতা তরুণদের জন্য আত্মপ্রকাশের বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।
তবে শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, নাহিদ নিজের ক্যারিয়ারকে প্রসারিত করেছেন একজন কোচ ও পরামর্শদাতা হিসেবে। ২০২১ এবং ২০২২ সালে তিনি ট্রাস্ট ব্যাংক ন্যাশনাল তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপ ও জেলা তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় দলকে নেতৃত্ব দেন। তার কোচিং দক্ষতা তরুণ খেলোয়াড়দের এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্ব মঞ্চে বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ তায়কোয়ান্দো ফেডারেশনের বোর্ড সদস্য। এ দায়িত্বে থেকে নাহিদ কাজ করছেন নীতি প্রণয়ন, নতুন খেলোয়াড়দের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। পাশাপাশি গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তিনি বিশ্ব তায়কোয়ান্দো সম্প্রদায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রও তৈরি করছেন, যা বাংলাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও নাহিদ থেমে থাকেননি। সেখানে তিনি কোচিং অভিজ্ঞতায় বৈচিত্র্য অর্জন করেছেন। বাংলাদেশে যেখানে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়াবিদ তৈরি করাই মূল লক্ষ্য ছিল, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীরা তায়কোয়ান্দো শিখছে আত্মরক্ষা, ফিটনেস ও মানসিক শৃঙ্খলার জন্য। তাই তিনি শিক্ষণ পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণের ধরনও সে অনুযায়ী মানিয়ে নিয়েছেন।
উল্লেখ্য, নাহিদের বড় স্বপ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব তায়কোয়ান্দো স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। এটি হবে শুধু একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, বরং তরুণদের ব্যক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্র। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিনিময় কর্মসূচি চালু করতে চান, যাতে দুই দেশের ক্রীড়াবিদরা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে পারে।
তরুণদের উদ্দেশে নাহিদের মূল পরামর্শঃনাহিদ বলেন, “শেখার দিকে মনোযোগ দিন, শুধু জেতার দিকে নয়। তায়কোয়ান্দো চরিত্র, শৃঙ্খলা ও মানসিক শক্তি গড়ে তোলে। ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে এটি আপনাকে শুধু খেলাধুলায় নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল হতে সাহায্য করবে।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করাকে নাহিদ জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা মনে করেন। তার ভাষায়, “প্রতিবার আমি ইউনিফর্ম পরি বা ডোজোতে পা রাখি, তখনই মনে হয় বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার একটি দায়িত্ব আমার কাঁধে।”
এভাবেই নাহিদের যাত্রা ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু হয়ে আজ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উড়াচ্ছে। তার এই পথচলা প্রমাণ করে, সংকল্প ও শৃঙ্খলা থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/আইএমএস/ওএফ