
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শহীদ সালাম-বরকত হল কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২৯৯ জন হলেও দেখা গেছে, সেখানে ব্যালট পেপার রাখা হয়েছে প্রায় ৪০০টি- যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এই কেন্দ্রেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৮টি কেন্দ্রে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে-১০ থেকে ২০ শতাংশ, এমনকি তার চেয়েও বেশি অতিরিক্ত ব্যালট পেপার রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচনে অনেক প্রার্থীর ভোটগ্রহণে অভিজ্ঞতা নেই- এমন ধারণা থেকে ভুল হলে পুনরায় ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতেই কিছু অতিরিক্ত ব্যালট রাখা হয়েছে। তারা দাবি করেন, কোনো অস্বচ্ছতার সুযোগ নেই।
তবে প্রার্থী ও ভোটাররা বলছেন, পৃথিবীর কোনো নির্বাচনেই শতভাগ ভোট পড়ে না। জাকসু নির্বাচনেও সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভোট পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারপরও অতিরিক্ত ব্যালট রাখা হলে ভোট কারচুপির আশঙ্কা থেকে যায়।
ছাত্রী কেন্দ্রে ঢুকে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থীর বিশৃঙ্খলা, সাংবাদিককে গলাধাক্কাছাত্রী কেন্দ্রে ঢুকে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থীর বিশৃঙ্খলা, সাংবাদিককে গলাধাক্কা
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে শহীদ সালাম-বরকত হলে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। বৃষ্টির কারণে ভোটগ্রহণে কিছুটা বিলম্ব হলেও পরে গতি স্বাভাবিক হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তা মওদুদ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কিছু ব্যালট বেশি এসেছে। বিষয়টি প্রার্থী ও নির্বাচন কমিশনে জানানো হয়েছে। কমিশন এসে নিয়ে যাবে। ব্যালট পেপার যে অতিরিক্ত দেওয়া হবে, আমাদের জানা ছিল না।’
অতিরিক্ত ব্যালট পেপার রাখার ব্যপারে তিনি বলেন, ‘যেহেতু ৩৩ বছর পর ভোট, অনেকের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে অনেকের ভুল হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত কাউকে দ্বিতীয়বার ব্যালট দিতে হয়নি। তাই, বিষয়টি নিয়ে প্রার্থীরা জানালে কমিশনকে জানানো হয়েছে। ভোটগ্রহণের আগে প্রার্থীদের ব্যালট বাক্স খুলে দেখানো হয়েছে। এখানে অস্বচ্ছ হওয়ার সুযোগ নেই।’
আ ফ ম কামাল উদ্দিন হল কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ৩৩৩ জন। সেখানেও অতিরিক্ত ৭০টির মতো ব্যালট পেপার দেওয়া হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা শিবলি নোমান বলেন, ‘প্রশ্ন উঠতেই পারে। অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ যাতে ভুল করলে পুনরায় দেওয়া যায়, সেজন্যই মূলত এমনটা। যদিও এখনো এরকম কিছু হয়নি। তবে অতিরিক্ত ব্যালট কমিশন ফেরত নিয়ে যাবে।’
এই কলে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতুর পোলিং এজেন্ট মেহেদী হাসান বলেন, ‘যত সুষ্ঠু নির্বাচনই হোক, ৮০ ভাগের বেশি ভোট পড়ার সম্ভাবনা নেই। তারপরও কেন অতিরিক্ত ব্যালট রাখা হয়েছে প্রশাসনের সুস্পষ্ট ব্যাখা থাকা উচিত।’
ভোটার লাইনে দাঁড়ানো এ হলে আবাসিক শিক্ষার্থী সোহান বলেন, ‘ব্যালট পেপারে কারচুপির বিষয়টি এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার কেন, বিষয়টি সন্দেহ জাগায়।’
একই চিত্র পাওয়া যায় মীর মশাররফ হোসেন, তাজউদ্দীন আহমদ, মওলানা ভাসানী, কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল কেন্দ্রে।
মীর মশাররফ হোসেন হল কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসার মুজিবুর রহমান বলেন, ‘শতভাগ ভোট পড়ে না, তারপরও দেওয়া হয়েছে। নষ্ট হওয়ায় ঝুঁকি থাকায় মূলত এমনটা। ব্যবহার না হলে ফেরত যাবে।’
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) জিএস (সাধারণ সম্পাদক) প্রার্থী আবু তৌহিদ মো. সিয়াম বলেন, ‘শুধু অতিরিক্ত ব্যালট পেপার নয়, শিবিরসহ অনেক প্রার্থীকে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। এটি উদ্বেগের। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তারা সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারেনি। তারপরও শেষ পর্যন্ত ভোট সুষ্ঠু হলে আমরা অবশ্যই লড়ে যাব।’
অতিরিক্ত ব্যালট পেপার রাখায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী আরিফুল্লাহ আদিব। তিনি বলেন, ‘শহীদ সালাম-বরকত হলে ১শটির মতো ব্যালোট পেপার কার স্বার্থে? বিষযটি নিয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বসেছিলাম, ওনারা জানিয়েছিলেন প্রতিটি কেন্দ্রে যত ভোটার থাকবেন ততটাই ব্যালট পেপার যাবে। কারণ, শতভাগ ভোটার উপস্থিতির নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। এটি স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য চরম উদ্বেগজনক।’ তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে কেন অতিরিক্ত ব্যালট পেপার রাখা হলো?
তিনি বলেন, ‘কারণ জানতে আমরা অনেকবার জানতে চেয়েছি, তারা সঠিক ব্যাখা দিতে পারেনি। অতিরিক্ত দু-একটা নষ্ট হতে পারে। কিন্তু কোনোটাতেই শতভাগ ভোটদান হয় না।’
জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. খো. লুত্ফুল এলাহী বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর জাকসু নির্বাচন হচ্ছে, অনেকে জানে না কিভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হয়। ভুল ব্যালট বাতিল করে নতুন ব্যালটে ভোটদানের সুযোগ দিতেই মূলত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম