
কক্সবাজারে দুই মাসব্যাপী আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন
জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম (রহ.) কক্সবাজার ক্যাম্পাসে দুই মাসব্যাপী (জুলাই–আগস্ট) আরবি ভাষা ও ইসলামি সংস্কৃতি প্রশিক্ষণ কর্মশালা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) সমাপনী দিনে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সনদ বিতরণ এবং প্রধান প্রশিক্ষক, বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি স্কলার মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আরবি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ও গবেষক ড. যায়েদ বিন মুহাম্মদ ইবনে জুহানীর বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সনদ তুলে দেওয়া হয়। প্রধান প্রশিক্ষক ড. যায়েদ বিন মুহাম্মদ ইবনে জুহানীর বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সবাই আবেগাপ্লুত হয়।
অনুষ্ঠানে জামিয়ার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলেন, “আজকের দিনটি আমাদের সবার জন্য বিশেষ। আপনার বিদায় আমাদের হৃদয়ে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে। আমরা আজ কেবল একজন বিদেশি অতিথিকে বিদায় দিচ্ছি না, বরং একজন আল্লাহ-ভক্ত ও ৮০ বছরের বয়োবৃদ্ধ, যিনি দ্বীনের অকৃত্রিম দরদী, মেধাবী, কর্মঠ এবং বিশ্ববিখ্যাত ইসলামের স্কলার। তিনি আমাদের জীবনের সহীহ দ্বীন শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।”
বিদায়ী অতিথিকে উদ্দেশ্য করে আরো বলা হয়, “আপনার সোহবত থেকে আমরা সহীহ দ্বীন শিখেছি—কিভাবে সহীহ এলেম হাসিল করতে হয় এবং কিভাবে প্রতিটি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়। আপনার নেক সোহবত, হাতে কলমে দেয়া শিক্ষা এবং দ্বীন শিক্ষার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। অনেক দূর থেকে এসে আপনার বয়োবৃদ্ধ শরীর নিয়ে দ্বীনি শিক্ষার কাজের প্রতি আপনার নিষ্ঠা আমাদের জীবনে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছে। আপনার অবদান কখনোই ভোলা যাবে না।”
গত দুই মাসব্যাপী জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম (রহ.) এর সার্বিক সহযোগিতায় এই কর্মশালায় প্রতিষ্ঠানটির তিন শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
অন্যান্যদের মধ্যে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও গবেষক ড. বরিক বিন মুহাম্মদ, ড. সাউদ বিন আবদুল আজিজ, ড. মনছুর বিন আবদুল আজিজ। ড. যায়েদ বিন মুহাম্মদ ইবনে জুহানীর নেতৃত্বে ৫ জন শিক্ষক বাংলাদেশে এসেছেন।
আরবি কথোপকথন, ইবারত পাঠ, ক্লাসে পাঠদান ও উপস্থাপনা কোর্সের মূল বিষয় ছিল। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর এবং মাগরিবের পরে কোর্স পরিচালনা, প্রশিক্ষণ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম (রহ.) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শায়েখ সালাহুল ইসলাম হাফিজাহুল্লাহ। মূলত জামিয়ার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আরবি ভাষাসহ বিভিন্ন দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।
কোর্স শেষে অংশগ্রহণকারীরা তাদের আনন্দের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। আরবি কিতাব সুন্দর ও সাবলীলভাবে পড়া, জুমআর খুতবা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা, আধুনিক আরবির বিভিন্ন ব্যবহার জানা, আরবিতে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করা সহ কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত ও সুগঠিত করা এবং আরবি পাঠদান উপভোগ্য করার ক্ষেত্রে এই কোর্স বড় অবদান রাখবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
জামিয়ার কর্মরত শিক্ষকেরা বলেন, “ছাত্রদের পাশাপাশি এই কোর্সে আমাদেরও সেই শূন্যতা পূরণ হয়েছে। আমরা সমষ্টিগতভাবে অনেক উপকৃত হয়েছি। বহুদিন থেকেই আরবি চর্চা করি, তবে এই কোর্সের মাধ্যমে যেসব ত্রুটি ছিল তা শুধরে পেরেছি। নতুন অনেক বর্ণনাভঙ্গি, আরবি পড়ার সঠিক পদ্ধতি, আরবিতে পাঠদান দেওয়ার বিষয়গুলো শিখতে পেরেছি। এছাড়া আরবির বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি।”
তারা আরো বলেন, “এই কোর্সে অধিক অনুশীলনের কারণে আরবিটি অনেক সহজ মনে হচ্ছে। আমরা কোর্স থেকে আধুনিক আরবি ব্যবহার শিখেছি। আরবি কবিতার চমৎকার দিকগুলোও নতুনভাবে উপলব্ধি করছি।”
জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম (রহ.) সহকারী পরিচালক সাউদ বিন সালাহুল ইসলাম বলেন, “আরবি ভাষা ও সাহিত্য প্রচারে জামিয়া কর্তৃপক্ষ বহুমুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। সকলের দোয়া ও সহযোগিতায় অত্র জামিয়া আরও সামনে এগিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।”
তিনি আরো বলেন, “এই কর্মশালা জামিয়ার কর্মরত ও শিক্ষারত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আরবি ভাষা দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। ইসলামি সংস্কৃতির প্রত্যাশাও বেড়েছে।”
জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম (রহ.) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শায়েখ সালাহুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি স্কলার-দাঈদের সহিহ ঈমান-আকিদা ভিত্তিক কর্মশালার অংশগ্রহণকারীরা আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির গভীরতা উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা অর্জন করেছে। অত্র জামিয়ার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য আরবি ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কর্মশালা স্থানীয় জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যা তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জ্ঞান বিকাশে সহায়তা করবে।”
উল্লেখ্য, জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম (রহ.) কক্সবাজার শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চ শিক্ষার পথ সুগম করার জন্য বহির্বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদনে সক্ষম হয়েছে। গত বছর ২৪ জুলাই বিশ্বের অন্যতম ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সনদের সমতা চুক্তি (মুয়াদালা) সম্পন্ন হয়, যা জামিয়ার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সাফল্য।