প্রকাশ: রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫, ৭:৪৬ পিএম আপডেট: ১৭.০৮.২০২৫ ৭:৫৪ PM

আজিজুরের পরিবার
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাতে যান রিকশাচালক আজিজুর রহমান। সেখানে গিয়ে উৎসুক জনতার হাতে নির্যাতন ও পরবর্তীতে তাকে জুলাই গণুঅভ্যুত্থানের সময়ের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম ইসরাত জেনিফার জেরিন তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
জানা গেছে, আজিজুর রহমানের বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ঘোড়শাল গ্রামে। তার গ্রামের পরিবারের ৩ সদস্যের মধ্যে বৃদ্ধ বাবা-মা ও এক ভাই রয়েছে। তাদের মধ্যে সবাই শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ৩ বছর আগে তাগিদে গ্রাম ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় যান আজিজুর রহমান।
আজিজুরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশে জঙ্গলে ঢাকা একটি জরাজীর্ণ টিন ও পাটকাঠির ছাপড়া ঘরের মধ্যে বসবাস করে আজিজুরের পরিবার। বৃদ্ধ বাবা আতিয়ার রহমান ও মা নুরি বেগম শারীরিক প্রতিবন্ধী ও ছোট ভাই ইঞ্জিল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। আজিজুলের গ্রেপ্তারের খবর শুনে তাদের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ তৈরি হয়েছে।
ছেলের ভিডিও মোবাইলে দেখার পর থেকে অঝোরে কাদছে বৃদ্ধ মা। এলাকাবাসী ও স্বজনরা জানায়, চতুর্থ শ্রেণীর গন্ডি না পেরোতেই আজিজুর ধরেন সংসারের হাল। কখনও রাজমিস্ত্রির সহকারী আবার কখনো অন্যের জমিতে কাজ করে চালাতেন সংসার। তিন বছর আগে জীবিকার সন্ধানে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় যান আজিজুর। সেখানে রিকশা চালিয়ে যা উপার্জন হতো তা দিয়েই চলতো তাদের সংসার। পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতেও পাঠাতেন টাকা। সেই টাকা দিয়েই অসুস্থ মা-বাবা ও ভাই কোনো মতে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছিলেন। কিন্তু আজিজুর গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরিবারের চুলায় জ¦লছে না আগুন। বৃদ্ধ মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে যা খাবার পাচ্ছে তা খেয়েই পার হচ্ছে দিন।
স্বজনরা বলছেন, আজিজুরের পাঠানো টাকায় চলতো তাদের সংসার। আজিজুল কখনোই কোনো দলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। আজিজুর দ্রুত মুক্তি না পেলে না খেয়ে মরতে হবে তাদের।
আজিজুর রহমানের মা নুরি বেগম বেগম বলেন, “ছেলের পাঠানো টাকা দিয়ে কোনমতে সংসার চালায়। ভাঙা ঘরে থাকতে কষ্ট হয়। তার উপর আমরা তিনজনই অসুস্থ। ছেলে টাকা না পাঠালে না খেয়ে মরতে হবে। আজিজুর কোনদিন রাজনীতি করেনি। ছোটবেলা থেকেই কর্মঠ ছিল। কেন যে ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গেল ছেলেটা। মোবাইলে মারধোরের ভিডিও দেখে কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। রাতে ঘুম হচ্ছে না। ছেলের উপর হামলা হচ্ছে এমন ভিডিও দেখে কোন মা কি সহ্য করতে পারে? আজিজুরকে মুক্তির জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করছি।”
আজিজুরকে মারধোর ও গ্রেপ্তারের ভিডিও দেখে কাঁদতে কাঁদতে আজিজুরের বাড়িতে এসেছেন তার খালা সিকারুন বেগম। বোনের ছেলের সাথে এমন অবিচারের ঘটনায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়েছে তারও। তিনি দ্রুত আজিজুরের মুক্তি চান।
গ্রামের বাসিন্দা হামিদুর রহমান বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আজিজুর শান্ত প্রকৃতির। কারো সাথে ঝামেলা করা বা রাজনীতি করা এসব তার অপছন্দ ছিল। কোন রাজনৈতিক দলের সাথে তাকে মিশতেও দেখিনি। কিন্তু মোবাইলে দেখলাম সে ফুল নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে উৎসুক জনতার হাতে মারধোরের শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে তাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে আজিজুরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আমরা গ্রামবাসী তার মুক্তি চাই।”
পাশের এলাকার হযরত আলি বিশ্বাস বলেন, “একজন আরেকজনকে ভালবাসতেই পারে। এজন্য সে ওই দল করে বা করতে হবে এমনটা না। ভালবাসতে দল করা লাগে না। আজিজুরের সাথে অন্যায় হয়েছে।”