“বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে গণহত্যা-পরবর্তী বাংলাদেশের ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠন বিষয়ে পরামর্শ সভা”

গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য মানসিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
গত ১৬ বছরে অসংখ্য মানুষ গুম হয়েছে, কিন্তু এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো আমাদের হাতে নেই। গুমের শিকার পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং তারা মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে দিনাতিপাত করছে। অবিলম্বে গুম কমিশন গঠনসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য একটি আর্থিক তহবিল গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য মানসিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।
আজ বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত বিশেষজ্ঞভিত্তিক পরামর্শ সভায় গুমের শিকার ব্যক্তি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) এবং বাংলাদেশ ২.০ ইনিশিয়েটিভ যৌথভাবে এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহাদী আমিন বলেন, “যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় কিংবা রাজনৈতিকভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করা হয়নি। গুমের শিকার পরিবারকে সহায়তা করতে কত টাকার প্রয়োজন? রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে প্রতিটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। এটা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।”
তিনি আরো বলেন, “আমি যেহেতু বিএনপিকে প্রতিনিধিত্ব করছি, আমাদের দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা রয়েছে। আগামীতে বিএনপি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে এলে তারেক রহমান সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াবেন। এটি আমাদের অন্যতম প্রধান দায়বদ্ধতা।”
বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, “ভুক্তভোগীদের শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও যেভাবে নির্যাতিত করা হয়েছে, সেটি প্রতিকারের সময় বিবেচনায় নিতে হবে। বারবার সেমিনার নয়, বাস্তবতার আলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ যেন রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে গিয়ে ভুক্তভোগীদের নিয়ে খেলা না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি না আসে, তাহলে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।”
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, “ভুক্তভোগীদের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, আমরা তা করতে পারছি না। বিচার অবশ্যই দরকার, তবে দ্রুত বিচারের নামে যেন নতুন করে কোনো অবিচার না হয়, সেটাও মাথায় রাখতে হবে। আর্থিক সহায়তা যেন শুধু ফ্ল্যাটকেন্দ্রিক না হয়ে প্রয়োজনভিত্তিক হয় এবং বণ্টনে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা দরকার।”
জাতিসংঘ বাংলাদেশের সিনিয়র মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান বলেন, “গুমের শিকার ব্যক্তিদের জন্য কেবল বিচারই নয়, আরও অনেক কিছু করার প্রয়োজন আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কমিশন গঠন নিয়ে ঐক্যমত্য গড়ে তোলা সম্ভব। তারা যে সমস্যার সম্মুখীন, সেগুলোর সমাধান হওয়া উচিত। আমি আমার জায়গা থেকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।”
অনুষ্ঠানে এক ডজনেরও বেশি গুমের শিকার ভুক্তভোগী তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, “ভুক্তভোগীরা চাকরি বা ব্যবসা কিছুই করতে পারছেন না। অবিলম্বে গুম কমিশন গঠন করে ভুক্তভোগীদের জন্য একটি তহবিল গঠন করুন। সরকারের ট্যাক্সের টাকার প্রয়োজন হবে না, সারা দুনিয়া এই উদ্যোগে সহায়তা করবে।” এ সময় তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সরকার কি এই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারবে না?”
আরেক ভুক্তভোগী কর্নেল হাসিনুর বলেন, “বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে যা যা প্রয়োজন, শেখ হাসিনা তাই করেছেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জঙ্গি মামলা দিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। একটি কমিশনের মাধ্যমে এই জঙ্গি নাটকের সমাধান করা উচিত।”
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু তার ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দেন এবং দোষীদের বিচার নিশ্চিত করতে সাক্ষীদের নিরাপদ সাক্ষ্য দেওয়ার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে ইউনিভার্সিটি অব রেজিনার (কানাডা) সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ বলেন, “গণহত্যা-পরবর্তী ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশনের জন্য ডিকলোনিয়াল লোকাল ফ্রেমওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি অবশ্যই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় ভিত্তি করে হতে হবে। অন্য দেশ থেকে কপি-পেস্ট করা যাবে না। এ জন্য বিপুলসংখ্যক ভুক্তভোগীর সঙ্গে শলা-পরামর্শ করতে হবে।”
সেমিনারে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সেখানে গুম সংক্রান্ত সত্যতা স্বীকার, অপরাধ বিচার ব্যবস্থার (ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম) মাধ্যমে দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ একাধিক সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় আরও যে সুপারিশগুলো উঠে এসেছে তা হলো-
• গুমের শিকার ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন
• কেন্দ্রীভূতভাবে তথ্য (ডেটা) সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
• গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি
• ভুক্তভোগীদের রাজনীতিকীকরণ না করা
• ভবিষ্যতে গুমের ঘটনা প্রতিরোধে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা।
সভায় আরো বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তী সরকারের সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য মুস্তাইন জহির, প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর, মানবাধিকার উন্নয়ন কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ জিয়ানুল কবির, সামারুহ মির্জা, আইরিন খান, ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাসির, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত সাইফ আরেফিন প্রমুখ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ২.০ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক শর্মিলা নওশিন রিতু এবং জাতিসংঘের জুনিয়র কনসালটেন্ট ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন।