
সংগৃহীত ছবি
ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা (Personality Disorders) বলতেই আমরা সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের কথা ভাবি। অথচ এই সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় শিশুবেলাতেই প্রকাশ পায়। কিন্তু বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা এখনও সীমিত। তাই শিশুদের মধ্যে এমন সমস্যার লক্ষণ চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন শিশুর চিন্তাধারা, আবেগপ্রকাশ ও আচরণ বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক আচরণ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন হয় এবং তা দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে।
সাধারণ লক্ষণগুলো কী কী?
১. পুনঃপুন আক্রমণাত্মক বা বিরূপ আচরণ
২. সামাজিক সম্পর্ক গড়তে অসুবিধা
৩. সহানুভূতি বা আবেগ প্রকাশে দুর্বলতা
৪. অতিরিক্ত শঙ্কা ও নিয়মের প্রতি কঠোর অনুরাগ
৫. মেজাজের হঠাৎ পরিবর্তন ও অতিরিক্ত উত্তেজনা
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা সাধারণত ১৮ বছরের আগে পুরোপুরি ব্যক্তিত্ব সমস্যা নির্ণয় করেন না, তবে প্রাথমিক লক্ষণগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করা গেলে তা প্রতিরোধ বা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা অনেক সময় ‘দুষ্টুমি’ বা ‘অভিভাবকের শাসনের অভাব’ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে তো একে 'অলৌকিক কিছু' বলেও আখ্যা দেওয়া হয়।
মূল চ্যালেঞ্জগুলো:
অসচেতনতা: শিক্ষক ও অভিভাবকেরা অনেক সময় মানসিক সমস্যার লক্ষণ চিনতে ব্যর্থ হন।
ট্যাবু: মানসিক সমস্যাকে এখনো লজ্জার বিষয় বলে মনে করা হয়।
বিশেষজ্ঞের অভাব: শিশুদের জন্য প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত।
সেবার সীমাবদ্ধতা: গ্রাম ও শহরতলিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত।
কারণগুলো কী হতে পারে?
পারিবারিক পরিবেশ: ঝগড়া, অবহেলা কিংবা নির্যাতন শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলে।
পড়াশোনার চাপ: কঠোর প্রতিযোগিতা ও শাস্তিমূলক শিক্ষা পরিবেশ শিশুর আবেগে বাধা সৃষ্টি করে।
নগরায়ন ও প্রযুক্তি: মোবাইল-ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার ও একাকীত্ব শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়।
দারিদ্র্য ও ট্রমা: অর্থনৈতিক কষ্ট, শিশুশ্রম ও গৃহহীনতা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি:
১. আচরণগত থেরাপি (Behavioral Therapy)
২. পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং
৩. স্কুল পর্যায়ে মানসিক সহায়তা
৪. অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি
করণীয়
১. সচেতনতা বাড়ানো
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারাভিযানের মাধ্যমে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
২. স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (অন্তত উপজেলা পর্যায়ে) মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
৩. বিশেষজ্ঞ তৈরির উদ্যোগ
আরও বেশি চাইল্ড সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট এবং সোশ্যাল ওয়ার্কার তৈরি করতে হবে।
৪. তথ্যভিত্তিক গবেষণা
বাংলাদেশের বাস্তবতায় উপযোগী মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণায় জোর দিতে হবে।
৫. সরকারি সহায়তা ও নীতিমালা
২০১৮ সালের 'মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট' বাস্তবায়ন করে শিশুকেন্দ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান না হলে ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রকেই এর খেসারত দিতে হবে। শিশুর প্রতিটি আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে, সহানুভূতি ও সচেতনতার মাধ্যমে আমরা গড়ে তুলতে পারি এক সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রজন্ম। সময় এসেছে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, সমর্থন এবং সেবার ব্যবস্থা গড়ে তোলার।