বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেয়া হবে না       নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মোংলায় বিএনপির বিক্ষোভ       আওয়ামী লী‌গের তিন নেতা গ্রেপ্তার      সাতক্ষীরায় জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রকল্পের সমাপনী      সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ       আইনশৃঙ্খলা সভায় হট্টগোল, তর্কে জড়ালেন এমপি হান্নান      লাতিন আমেরিকার দুই দলকে হারাল জাপান-কোরিয়া      কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৫১ কিশোর আটক      প্রথম ১৪ ওয়ানডেতেই ইতিহাস গড়লেন ম্যাথু ব্রিটজকে      ২৫ সেপ্টেম্বরের মুর্তজা কিজিলবাশের কনসার্ট স্থগিত      অঙ্কন-নন্দিতার দ্বৈত কণ্ঠে আজ প্রকাশিত হচ্ছে ‘মথুরা’      ফোটন সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন      
আলিয়া মাদ্রাসার গ্রন্থাগার: বকশিবাজারে লুকিয়ে থাকা এক ইতিহাসের রত্নভান্ডার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫, ৮:৩০ পিএম

ঢাকার বকশিবাজারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক রত্নভান্ডার—আলিয়া মাদ্রাসার গ্রন্থাগার। ২৪৫ বছরেরও বেশি পুরোনো এই গ্রন্থাগার একসময় ছিল কলকাতায়, সেখানে টিকেছিল দীর্ঘ ১৬৭ বছর। দেশভাগের পর ৭৮ বছর আগে এটি স্থানান্তরিত হয় ঢাকায়, এবং আজও ইতিহাস, ধর্ম, সাহিত্য, বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ের অমূল্য দলিল বহন করে চলেছে।

কয়েক মাস আগেই এই গ্রন্থাগারে এসেছিলেন দুই বিদেশি গবেষক—থমাস নিউবল্ড, যিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান, এবং তার বন্ধু, ফারসি ভাষার পণ্ডিত শাহিন পিশবিন। তাদের সঙ্গে ছিলেন তারিক ওমর আলী (জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়) এবং ড. শহিদুল হাসান (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। গ্রন্থাগারের দুর্লভ সংগ্রহ দেখে তাদের অভিব্যক্তি—“এ এক অমূল্য রত্নভান্ডার!”

বিশেষ করে ড. শহিদুল হাসান মনে করেন, এ গ্রন্থাগার ১৯ শতকের বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের জ্ঞানচর্চা ও চিন্তাধারার অনন্য দলিল।

১৭৮০ সালে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় মাদ্রাসা-ই-আলিয়া। এটাই ছিল উপমহাদেশে আধুনিক ইসলামি শিক্ষার সূচনা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংগ্রহ—সবকিছুই স্থানান্তর করা হয় ঢাকায়। শুরুতে লক্ষ্মীবাজারে, পরে ১৯৬০ সালে স্থায়ীভাবে বকশিবাজারে ওঠে। এখানেই ঠাঁই পায় গ্রন্থাগারের দুর্লভ ও ঐতিহাসিক সংগ্রহ।

আজও মাদ্রাসার কক্ষে ছড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের চিহ্ন—পুরোনো চেয়ার-টেবিল, কাঠের আলমারি, আর তার ভেতরে সাজানো অসংখ্য দুর্লভ বই।

মাদ্রাসা ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত চার কক্ষবিশিষ্ট এই গ্রন্থাগারে ঢুকলেই ঘ্রাণ এসে জানান দেয় শতাব্দীপ্রাচীন বইয়ের উপস্থিতি। সারি সারি আলমারিতে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে আরবি, ফারসি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও কিতাব।

গ্রন্থাগারিক মাহমুদা বেগম জানান, এখানে রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার বই—ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাসসহ নানা বিষয়ে। এর মধ্যে অনেক বইই ব্রিটিশ আমলের ইসলামি জ্ঞানচর্চার ধারক।

এই লাইব্রেরির গর্বের জায়গা হলো হাতে লেখা বোখারি শরিফ, প্রাচীন ফিকাহগ্রন্থ, সাহাবিদের রচনাবলি ও ফারসি মহাকাব্য শাহনামা। কিছু বই এমনও আছে, যেগুলোতে মুঘল আমলের রাজদরবারের দৃশ্যাঙ্কিত ছবি রয়েছে।

কামিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক জানান, এই গ্রন্থাগারে এমন কিছু বই আছে যেগুলোর বয়স প্রায় ৪০০ বছর। চীন থেকেও এসেছে কিছু গ্রন্থ।

তাশফিকুল ইসলাম, গ্রন্থাগারের নিয়মিত এক শিক্ষার্থী, জানালেন—এখানে পাওয়া যায় আইন-ই-আকবরি, কিতাব আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা, আল-মাবসুত, ইবনে সিনার কানুন ফিত তিব, আল-শিফাসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ।

তার মতে, “এই বইগুলো শুধু ধর্মীয় নয়, আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তিবিদ্যা, জ্যামিতি, ব্যাকরণ, দর্শন—সবকিছুই একসঙ্গে পাওয়া যায় এখানে।”

যদিও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়ার সুযোগ পান, বাইরের কেউ এ গ্রন্থাগার ব্যবহার করতে চাইলে অধ্যক্ষের বিশেষ অনুমতি লাগে।ইরান দূতাবাস থেকেও গবেষকরা এসেছেন ফারসি বই পড়তে।
 
মাহমুদা বেগম বলেন, “যারা জানেন এখানে কী আছে, তারাই সাধারণত আসেন। এমনও অনেক পাণ্ডুলিপি আছে যেগুলো বিশ্বের আর কোথাও নেই।”

আধুনিক শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রাচীন গ্রন্থগুলো পড়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী ওমর ফারুক বলেন, “অনেকেই অনুবাদকের সাহায্য ছাড়া বইগুলো বুঝতে পারেন না। তাই অনেক শিক্ষার্থী লাইব্রেরি এড়িয়ে চলে, তথ্য খোঁজে অনলাইনে।”

তিনি মনে করেন, এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসার সময় এসেছে। “এগুলো আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার, এগুলো পড়ে আমরা নিজেদের ইতিহাসকে জানতে পারি,” বলেন তিনি।

বয়সের ভারে অনেক বইই এখন নষ্ট হওয়ার পথে। অধ্যক্ষ ওবাইদুল হক বলেন, “ই-লাইব্রেরি তৈরি ও ডিজিটাল সংরক্ষণ ছাড়া এই ধনভান্ডারকে টিকিয়ে রাখা কঠিন।”

মাহমুদা বেগমও মনে করেন, ই-বুক হলো সবচেয়ে কার্যকর উপায়। “বই নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক, তবে প্রতিরোধ সম্ভব। ডিজিটাল সংরক্ষণ জরুরি,” বলেন তিনি।

ড. শহিদুল হাসান ভবিষ্যতে এই গ্রন্থাগার সংরক্ষণে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চাইলে তিনি গবেষণা ও সংরক্ষণের কাজে যুক্ত হতে প্রস্তুত।

আলিয়া মাদ্রাসার এই গ্রন্থাগার শুধু মাদ্রাসার সম্পদ নয়, বরং এটি বাংলা অঞ্চলের ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির জীবন্ত ইতিহাস। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এই প্রতিষ্ঠানকে আরও আধুনিক করে গড়ে তোলা উচিত—যাতে জ্ঞানচর্চা হয় সবার জন্য উন্মুক্ত, প্রযুক্তির সাহায্যে সংরক্ষিত ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।

স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  আলিয়া মাদ্রাসা গ্রন্থাগার  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close