
ভালো বেতনের চাকরি ও উন্নত জীবনের আশ্বাসে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের অন্তত অর্ধশতাধিক যুবককে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় দুঃস্বপ্নে—লিবিয়ায় আটকে রেখে চালানো হয়েছে অমানবিক নির্যাতন, আদায় করা হয়েছে কোটি টাকার মুক্তিপণ।
ভয়ঙ্কর এই মানবপাচার সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন এলাকারই জামাল কারিগর, যিনি স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের ছায়াতলে থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই রয়ে গেছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
শিরখাড়া গ্রামের আলাই কারিগরের ছেলে জামাল কারিগর এলাকার যুবকদের আশ্বস্ত করেন, মাত্র ৩ ঘণ্টায় পানি পথে ইতালি পৌঁছাতে পারবে।
এরই প্রলোভনে যুবকরা রাজি হন বিশাল অঙ্কের টাকা দিতে। হাসান হাওলাদার নামে এক কলেজছাত্র ১৩ লাখ টাকায় ‘স্পন্সর ভিসা’ চুক্তিতে রাজি হন। তাকে প্রথমে দুবাই, পরে লিবিয়ায় নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় মাফিয়াদের কাছে। সেখানেই শুরু হয় সিনেমা স্টাইলে নির্যাতন—হাত-পা বেঁধে চাবুক মারা, ক্ষত জায়গায় পোকা ধরা, ভিডিও করে পরিবারকে পাঠানো। পরিবার টাকা না দিলে বাড়ে নির্যাতনের মাত্রা।
একই গ্রামের রুহুল শেখ মাফিয়াদের নির্যাতনে প্রাণ হারান। মিন্টু হাওলাদারকে ছাড়িয়ে আনতে পরিবার দিতে বাধ্য হয় ২০ লাখ টাকা।
শাহ আলম মাতুব্বর বলেন, “জামাল ১২ লাখ টাকা নিয়ে আমাকে মরুভূমিতে আটকে রেখে পেটায়। আমি এর কঠোর বিচার চাই।”
নির্যাতনের বিচার চেয়ে পরিবারের সদস্যরা মামলা করলে দালাল জামাল তাদের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে।
হাসান হাওলাদারের বাবা হায়দার হাওলাদার বলেন, “আমার ছেলের মুক্তির জন্য ১৫ লাখ টাকা দিয়েছি। মামলা করলে জামাল উল্টো আমার বিরুদ্ধেই মামলা দিয়ে জেলে পাঠায়।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জামাল কারিগরের বিরুদ্ধে অন্তত ১০টির বেশি মামলা রয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অভিযোগ আছে, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের ভয় দেখিয়ে তারা আইনি প্রক্রিয়াকে ভেঙে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, জামাল কারিগর দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারের ভয়াবহ সিন্ডিকেট চালিয়ে আসছেন। ইউরোপে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে লিবিয়ায় পাঠিয়ে ‘গেমঘরে’ আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করছেন কোটি কোটি টাকা।
মিন্টু হাওলাদারের মা সাবিনা বেগম বলেন, “দালাল জামাল আমার ছেলেকে বিক্রি করে দিয়েছে। এর বিচার চাই।”
হাসান হাওলাদারের মা রিনা বেগম বলেন, “ভিটেমাটি বিক্রি করেও ছেলেকে উদ্ধার করতে পারছি না। জামালের ফাঁসি চাই।”
এই সব অভিযোগ অস্বীকার করে জামাল কারিগর বলেন, “আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে। আমি নিজেই ছেলেকে ইতালি পাঠাতে লাখ লাখ টাকা খরচ করেছি। কাউকে হুমকি দিইনি, আমি ব্যবসায়ী মানুষ।”
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভাস্কর সাহা বলেন, “দালালদের আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে। ভয়ভীতি দেখিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।”
মাদারীপুর সদর উপজেলার ইউএনও ওয়াদিয়া শাবাব জানান, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দালালদের তালিকা করা হয়েছে। খুব শিগগিরই তা বিভিন্ন বাজারে প্রকাশ্যে টাঙানো হবে।”
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ