
ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে লুট হওয়া শরিয়াহ্ ভিত্তিক ৫টি ব্যাংক একীভূত করে একটি বৃহৎ শক্তিশালী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী জুলাই মাসের শুরুতেই একীভূতকরণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। এতে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে এসব ব্যাংকের ভুক্তভোগী গ্রাহকদের মাঝে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
প্রাথমিকভবে ব্যাংকগুলোকে সরকারি মালিকানায় এনে মূলধন যোগান দেয়ার কথা জানিয়েছেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এর ফলে এসব ব্যাংকের গ্রহকরা তাদের আমানত ফিরে পাবেন বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
শুরুতে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য প্রচার করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য নানা ধরণের কূটকৌশল অবলম্বন করতে থাকেন। প্রকৃত তথ্য গোপন করে এক্সিম ব্যাংকে তারল্য সংকট নেই এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন ছাড়াই এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করতে চাচ্ছে বলে প্রচারণা চালাতে থাকেন। অথচ তারল্য সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নেয় ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) এর রিপোর্ট অনুযায়ী এক্সিম ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের ৪৮.২০ শতাংশই মন্দ ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন অনুযায়ী এডভান্স ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ৯২ শতাংশের অধিক না হওয়ার শর্ত থাকলেও তাদের এডিআর দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৭ শতাংশে। পরবর্তীতে দেশের প্রায় সবকটি মিডিয়ায় তাদের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ হয়ে গেলে এক পর্যায়ে মুখ বন্ধ হয়ে যায় নজরুল ইসলাম স্বপনের। এখন তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
ইতিমধ্যে শরিয়াহ্ ভিত্তিক দুর্বল ৫টি ব্যাংক একীভূত করে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্তে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের মাঝে। দেশের ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে একীভূতকরণের ফলে গঠিত নতুন ব্যাংকে গ্রাহকদের সবার পরিধি এবং মান বাড়বে। শহর কেন্দ্রিক শাখাগুলো গ্রামে স্থানান্তর করায় অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হবে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল হবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা এর ফলে লাভবান হবেন। ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক্সিম ব্যাংকের একজন গ্রাহক বলেন, “এতদিন এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে তাদের প্রকৃত তথ্য গোপন করেছে। ভিতরে ভিতরে এতো বাজে অবস্থা তা জানার পরে জমা টাকা নিয়ে বেশ আশংকায় ছিলাম। সরকারের একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত এবং গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষার আশ্বাস পেয়ে সেই আশংকা কেটে গেছে।”
একই ধরণের মন্তব্য করেছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল শাখার একজন গ্রাহক। তিনি বলেন, “অনেক দিন যাবত আমাদের কষ্টে জমানো টাকা তুলতে না পেরে ব্যাংকের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলাম। ভাবছিলাম জমানো টাকা আর ফেরত পাবো না। গভর্নরের ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত শুনে আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। এটা একটি ভালো সিদ্ধান্ত”।
৫ আগষ্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর লোপাট হওয়া ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা জনসম্মুখে চলে আসলে আমানতকারীরা টাকা তুলতে একযোগে ভীর করে ব্যাংকগুলোতে ফলে চরম তারল্য সংকটে পরে ব্যাংকগুলো। ব্যাংক কর্মকর্তা কর্মচারীরা তাদের ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকে। একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্তে তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের একজন শাখা ব্যবস্থাপকের সাথে এ বিষয়ে আলাপ হয়েছিলো। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পরে যখন গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে তারল্য সংকট শুরু হয়। এসময় গ্রাহকরা এসে চাহিদামত টাকা না পেয়ে খারাপ আচরণ শুরু করে। দিন দিন এ ধরণের ঘটনা বাড়তে থাকে। গ্রাহকদের খারাপ আচরণের এক পর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতা থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম চাকরি ছেড়ে দেবো। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত জানালেন এবং তারল্য সহায়তা দিতে শুরু করলেন। সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে চাকরিতে থেকে গেলাম। গভর্নরের ব্যাংক একীভূতকরণ একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এটা ছাড়া ব্যাংকগুলোর আর ঘুরে দাড়ানো কোনো পথ নেই।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, একীভূতকরণের ফলে ব্যাংকগুলোতে বিদ্যমান ১৫ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী, ৭৭৯টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫০০ এজেন্ট আউটলেট, ১ হাজারের বেশি এটিএম বুথ ও প্রায় ১কোটি গ্রাহক নিয়ে বিশাল আকারে চালু হবে নতুন ইসলামী ব্যাংক। যার মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভূক্তিতে আসবে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ঋণের মাধ্যমে স্বল্প আয়ের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ হবে স্বাবলম্বী এবং স্বনির্ভর। অগ্রসর হবে দেশ ও দেশের অর্থনীতি।
শরীয়াহ্ বিশেষজ্ঞদের মতে ইসলামী ব্যাংকিং এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রান্তিক মানুষের নিকট কল্যানমুখী ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়া এবং তাদের মাঝে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করা। একটি শক্তিশালী নতুন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী শরীয়াহর উদ্দেশ্য অনেকাংশে সম্প্রসারণ হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর