
ঢাকাতেই অবস্থান করছেন দেশের তিনটি সবচেয়ে বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান তিন নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। তবু তারা অধরা। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তদন্তের ঘোষণা এসেছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বর্তমান নির্বাচন কমিশন।
বিতর্কিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে যথাক্রমে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, কেএম নূরুল হুদা এবং কাজী হাবিবুল আউয়ালের বিরুদ্ধে। এই তিনজন ও তাদের নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তারা সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছেন এবং গণতন্ত্র ধ্বংসে ভূমিকা রেখেছেন।
ঢাকায় অবস্থান, কিন্তু তদন্ত নেই
জানা গেছে, তিনজনই রাজধানীর নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। কাজী রকিবউদ্দীন রয়েছেন বারিধারায়, স্ট্রোকের কারণে গুরুতর অসুস্থ। কেএম নূরুল হুদা উত্তরায় বই লেখায় সময় দিচ্ছেন। আর কাজী হাবিবুল আউয়াল বসুন্ধরার আই ব্লকে নিরবতায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের সন্তানরা সবাই বিদেশে।
তিনটি নির্বাচনে জড়িত কমিশনারদের অনেকেও ঢাকায় থাকলেও কারো বিরুদ্ধেই কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোতেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “আমার জানা মতে কেউ তদন্তের বিষয়ে কোনো নথিপত্র চায়নি। চাওয়া হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নির্বাচন কমিশনের নীরবতা
গত সোমবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘বিতর্কিত তিন জাতীয় নির্বাচন’-এর অনিয়ম তদন্তে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেও নির্বাচন কমিশন এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তারা নিজেরা কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করেনি, এমনকি নথিপত্র চাওয়ার মতো কোনো সরকারি অনুরোধও পায়নি।
কে কোথায়, কী করছেন
কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ: ২০১৪ সালের ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ নির্বাচন পরিচালনার মূল ব্যক্তি। বর্তমানে বারিধারার জে ব্লকে অবস্থান করছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ।
কেএম নূরুল হুদা: ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ নির্বাচনের কারিগর। উত্তরায় নিজ বাসায় আছেন, বই লিখছেন। জানান, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।”
কাজী হাবিবুল আউয়াল: ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের প্রধান ব্যক্তি। পদত্যাগের পর লোকচক্ষুর আড়ালে। বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে বাস করেন।
সংশ্লিষ্ট কমিশনারদের অনেকে এখন ঢাকায় নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন, কেউ কেউ আতঙ্কে আছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন।
ব্যতিক্রম মাহবুব তালুকদার
তিন বিতর্কিত কমিশনের একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন সাবেক কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি সবসময় নির্বাচনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ২০২২ সালের আগস্টে তিনি মারা যান।
সুবিধা ভোগকারীরা নীরব
ইসির কর্মকর্তারা জানান, দায়িত্ব শেষে তিন বছরের জন্য সিইসি ও কমিশনাররা বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ সুবিধা পান, চিকিৎসা খরচও রাষ্ট্র বহন করে। কিন্তু ৫ আগস্টের ঘটনার পর এখন পর্যন্ত কেউ এই সুবিধার আবেদন করেননি।
অতীত নির্বাচনের বিতর্ক
২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা ভোটে জয়ী ঘোষণা করে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রকিবউদ্দীনের কমিশন। ২০১৮ সালে রাতের আঁধারে ব্যালটে সিল পড়ে, তবু হুদার কমিশন তা চাপা দেয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটের হার নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয় আউয়ালের কমিশন, যার কারণে তা ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন নামে পরিচিত হয়।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিনটি নির্বাচনই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। আর তাতে সহযোগিতা করেছে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশনগুলো। ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার অধীনে এসব নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একচ্ছত্র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, যার মূল্য দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ