
ইসরায়েল এবার ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রসহ রাজধানী তেহরানের বেশ কিছু তেল পরিশোধনাগারে হামলায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এই ঘটনাকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার একটি নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শাহরান জ্বালানি ডিপোতে বিস্ফোরণের পর ব্যাপক আগুন লাগে। একই সঙ্গে শহরের দক্ষিণাংশে শাহরে রেই এলাকার একটি বড় তেল শোধনাগারেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সরকারি ছাত্র সংবাদ সংস্থা দাবি করেছে, শোধনাগারটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি এবং এখনও আংশিকভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। যদিও তারা এই আগুনের প্রকৃত কারণ জানাতে পারেনি।
বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রেও হামলা
সবচেয়ে বড় আঘাত আসে দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে, যা ইরান ও কাতারের যৌথ মালিকানাধীন। ইরানের জাতীয় গ্যাস উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশই এখান থেকে আসে। এ গ্যাসক্ষেত্রের ফেজ-১৪ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে বড় ধরনের ক্ষতি হয় এবং অফশোর প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদিন ১ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়।
এছাড়া, ফাজর-জাম গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রেও আগুন লাগে, যা দক্ষিণ পার্স থেকে গ্যাস নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে থাকে। ইরান সরকার জানিয়েছে, এই কেন্দ্রে হামলার ফলে দক্ষিণ ও মধ্য ইরানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে।
কেন এসব স্থাপনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ?
শাহরান জ্বালানি ডিপো: তেহরানের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি সংরক্ষণ ও বিতরণ কেন্দ্র, যেখানে প্রায় ২৬ কোটি লিটার সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। এখান থেকে পেট্রল, ডিজেল ও বিমান জ্বালানি সরবরাহ করা হয়।
তেহরান রিফাইনারি (শাহর-ই রেই): ইরানের প্রাচীনতম তেল শোধনাগারগুলোর একটি, যার দৈনিক পরিশোধন ক্ষমতা ২ লাখ ২৫ হাজার ব্যারেল। এই শোধনাগারে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হলে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় জ্বালানির যোগানে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্র: পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। এখানে প্রায় ১,২৬০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রয়েছে, যা বৈশ্বিক গ্যাস মজুদের ২০ শতাংশের কাছাকাছি।
বিশ্ববাজারে অস্থিরতার সম্ভাবনা
এই হামলার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগেই হামলার খবরে তেলের দাম ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সোমবার বাজার খোলার পর তা আরও বাড়তে পারে।
ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয় এই সমুদ্রপথ দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন চোকপয়েন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার বলেন, ‘‘ইসরায়েল চায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিক। তাদের লক্ষ্য, অন্তত ইরানে সরকার পতনের মতো কিছু ঘটানো।’’ তবে তিনি আরও বলেন, ‘‘ইরানও প্রতিশোধে বাধ্য হলেও তাদের কূটনৈতিকভাবে সহযোগী কম এবং ইসরায়েল আন্তর্জাতিক চাপকে খুব একটা আমলে নেয় না।’’
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ