
সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান আয়নাঘরের ভয়াল বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। ভয় আর অনিশ্চয়তার সেই সময়ের স্মৃতিতে তিনি বলেন, ‘আয়নাঘরে মৃত্যু বা মুক্তির আগে এক কাপ চা আসত। সেটাই ছিল এক ধরনের সিগন্যাল। হঠাৎ চা এলে বোঝা যেত-কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। হয় মুক্তি, নয়তো মৃত্যুদণ্ড।’
রাজধানীর গুলশানের বাসভবনে এক সাক্ষাৎকারে মারুফ জামান জানান, ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর তাকে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়। এরপর বিচারহীনভাবে ১৬ মাস তাকে ডিজিএফআই পরিচালিত এক টর্চার সেলে বন্দি রাখা হয়, যেটিকে তিনি ‘আয়নাঘর’ নামে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘জেআইসি মূলত জঙ্গি বা অপরাধীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তৈরি হলেও শেখ হাসিনার আমলে এটি হয়ে ওঠে ভিন্নমতের বিরুদ্ধে ভয়ংকর টর্চার সেল। অনেকে সেখানে জীবিত ফিরে আসেননি।’
মারুফ জামান জানান, তার অপরাধ ছিল ভারতীয় আগ্রাসন এবং হাসিনা সরকারের সমালোচনা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে তিনি ভারতীয় পানি নীতির সমালোচনা করায় ভারতীয় দূতাবাস ক্ষুব্ধ হয়। তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন, এজন্যও তাকে ‘বিএনপি ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ঘটনার দিন তার দুই মেয়ে বিদেশ থেকে ফিরছিল। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে অস্ত্রধারী লোকজন তার গাড়ি থামিয়ে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় নির্যাতনের এক বিভীষিকাময় অধ্যায়।
১৬ মাসের বন্দিজীবনে তার দাঁত ভেঙে যায়, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। ন্যূনতম চিকিৎসাও পাননি। একটি ছোট, অন্ধকার ঘরে তেলাপোকা, মশা আর ভেজা পরিবেশে দিন কেটেছে। তিনি বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার খিচুড়ি দেওয়া হতো। সেটার হিসাব রেখে আমি দিন-তারিখ বুঝতাম।’
এক প্রহরী একদিন চা নিয়ে এলে তিনি চমকে ওঠেন। তখন প্রহরী বলেন, ‘স্যার, হয়তো আপনাকে মেরে ফেলবে না। ডিসেম্বরে নির্বাচন শেষে মুক্তি পেতে পারেন।’ পরে এক অফিসার জানান, তাকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তবে শর্ত-এক বছর কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাবে না। না মানলে তার মেয়েদের মেরে ফেলা হবে।
২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল ধানমন্ডির বাসার সামনে ফেলে যায় তাকে। কিন্তু ফিরে এসেও স্বাভাবিক জীবন শুরু করা সহজ ছিল না। পরিচিত অনেকেই ভয় বা চাপের কারণে দূরে সরে যান।
তিনি জানান, আয়নাঘরের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেকেই এখনো স্বপদে বহাল। ফলে পুরো ঘটনার বিচার এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
সূত্র: যুগান্তর।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম