
সরকারি কর্মকর্তাদের সততা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নাগরিকসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে নাগরিকেরা সরকারি দপ্তরে এসে স্বস্তি পান এবং তাঁদের সমস্যার সমাধান হয়। সরকারি কর্মকর্তাদেরই হতে হবে নাগরিকদের আস্থার জায়গা।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা পরিষদে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কিট হস্তান্তর ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, সরকারি চাকরি মানে শুধু নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা-যাওয়া নয়; বরং জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধই একজন কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয়। তিনি বলেন, ‘আপনার বা আমার চেয়ার আজ আছে, কাল থাকবে না। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য আমরা কী অবদান রেখে গেলাম, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’
সরকারি সেবার গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সরকারি কর্মকর্তাদের আরও গতিশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা পূরণেও একই ধরনের দৃঢ়তা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতে হবে।
নাগরিকদের সঙ্গে মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, আইনের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করার প্রয়োজন নেই। তবে সেবাপ্রার্থীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া এবং তাঁদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হওয়া প্রত্যেক কর্মকর্তার দায়িত্ব।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদ্যাপন সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরা গেছে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ তরুণদের জন্য অনুকরণীয় হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা এবং সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর তিন মাসব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি এবং জেলা প্রশাসনের ‘নান্দনিক চট্টগ্রাম’ উদ্যোগের আওতায় গত ২৭ জুলাই থেকে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। প্রতি শনিবার জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উদ্যোগ নিলে কঠিন কাজও সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস) এলাকায় প্রায় ১৪ বছর ধরে জমে থাকা আড়াই শ ট্রাক বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। আনোয়ারা উপজেলার সরকারি কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সমন্বয় ও দলগত কাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন। এতে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, আনোয়ারার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদার, আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা।
অনুষ্ঠান শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক শোভাযাত্রা বের করা হয়। সদর সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি আনোয়ারা থানায় গিয়ে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের অংশগ্রহণে থানার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা একটি পুকুর পরিষ্কারের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। এ সময় বিভিন্ন সড়কে ফগার মেশিন দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়।
জেলা প্রশাসনের ‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ স্লোগান এবং দেশব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬-এর অংশ হিসেবে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু চিকিৎসার মাধ্যমে ডেঙ্গু মোকাবিলা সম্ভব নয়; প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। বাড়িঘর, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ময়লা-আবর্জনাও নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে।
ডেঙ্গুতে প্রাণহানি ঠেকাতে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁরা আমাদেরই ভাই কিংবা নিকটাত্মীয়। তিনি চান না, এভাবে আর কারও প্রাণহানি ঘটুক।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে নালা-নর্দমা পর্যন্ত সব জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে ডেঙ্গুবাহী মশার বিস্তার না ঘটে। থানার পুকুর পরিষ্কারের পাশাপাশি আশপাশের জঙ্গলও পরিষ্কার করা হবে। নিজেদের আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি অন্যদেরও সচেতন করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ