
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রাজমাল্লীহাট সিদ্দিকিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় চারটি পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকরা। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের দাবির মুখে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন।
রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাদ্রাসা মাঠে মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে তা বিক্ষোভে রূপ নেয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিধি মোতাবেক সম্পন্ন করার দাবি জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসাটিতে ল্যাব সহকারী, নৈশপ্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়া পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজন, পরীক্ষার মানবণ্টনসহ নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে প্রকাশ এবং কোনো ধরনের প্রভাব বা অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ না দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
কমিটি পুনর্গঠনের দাবি
মানববন্ধনে বক্তারা মাদ্রাসার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদত্যাগের পাশাপাশি পরিচালনা কমিটি বিলুপ্ত বা পুনর্গঠনের দাবি জানান। বর্তমান কমিটির কোনো সদস্যকে ভবিষ্যতে কমিটিতে না রাখার দাবিও তোলেন তাঁরা।
বিক্ষোভ চলাকালে নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে মাদ্রাসার টিআর প্রতিনিধি মিজানুর রহমান সাজুর বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীরা।
শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন
নিয়োগ-সংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি মাদ্রাসাটির শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা।
তাঁরা নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রণয়ন, প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষার আগে প্রশ্নের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগের তদন্ত ও প্রতিরোধ এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক কর্মসূচি চালুর দাবি জানান।
এ ছাড়া শিক্ষকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচন এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রতিবছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের দাবিও জানান তাঁরা।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসাটির ১৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে মাত্র তিনজন উত্তীর্ণ হয়েছে। তাঁদের হিসাবে পাসের হার ২১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ ফলাফলকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
বিক্ষোভকারীদের সামনে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর
বিক্ষোভের একপর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমানের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। পরে বিক্ষোভকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি তাঁদের সামনে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগেই আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলাম। তবে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি তা গ্রহণ করেনি। এবার এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের সম্মুখে আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছি।’
উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসা এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন স্থানীয়রা। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নজরে এলে তিনি আগামী ৫ অক্টোবর উপজেলা কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে বৈঠকে বসার আশ্বাস দেন।
এ ঘটনায় মাদ্রাসাটির নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে যেকোনো সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
মানববন্ধনে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য মো. মাইদুল ইসলাম, বিদ্যুৎসাহী সদস্য মো. দুলাল সরকার, প্রাক্তন ছাত্র সালমান ফারসিসহ স্থানীয়রা বক্তব্য দেন। এলাকাবাসীর পক্ষে কর্মসূচির আয়োজন করেন প্রাক্তন ছাত্র সালমান ফারসি।
তবে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ