
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়মিতভাবে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রতি মাসে দুটি করে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই হিসাবে বছরে ২৪টি লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী।
উপাচার্য জানান, সম্প্রতি বিএমইউতে ছয়টি সফল লিভার প্রতিস্থাপন হয়েছে। আরও চারটি প্রতিস্থাপনের জন্য রোগী নির্বাচন ও প্রস্তুতির কাজ চলছে। আগামী ১০ থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে আরও দুটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য চারজন রোগী প্রস্তুত রয়েছেন।
বিএমইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় এখানে কম খরচে লিভার প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। ভারতে একটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টে সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ হলেও বিএমইউতে এ ব্যয় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে।
উপাচার্য বলেন, এখন পর্যন্ত বিএমইউতে যেসব লিভার প্রতিস্থাপন হয়েছে, সেগুলোর খরচ সরকার বহন করেছে। ২০২৭ সাল পর্যন্ত সরকারি তহবিল থেকে এ ধরনের অস্ত্রোপচার বিনামূল্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের খরচ আরও কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আগে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এবার নিয়মিত কার্যক্রম
বিএমইউতে এর আগে ২০১৯ ও ২০২৩ সালে একটি করে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছিল। তবে তখন ধারাবাহিকভাবে কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার পর নিয়মিতভাবে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানান উপাচার্য।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর দুটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়। এরপর চলতি বছরের ৩ ও ৪ জুলাই এবং ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর আরও চারটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এসব রোগীর ফলোআপ চিকিৎসা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে চলছে।
ডোনার নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে উপাচার্য বলেন, মানবদেহে অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন অনুযায়ী আর্থিক লেনদেন বা অনিয়ম ঠেকাতে ডোনার ও গ্রহীতার সম্পর্ক, চিকিৎসাগত উপযুক্ততা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র একাধিক ধাপে যাচাই করা হয়। এরপর হাসপাতালের একটি বোর্ডও বিষয়গুলো পুনরায় যাচাই করে।
হাসপাতালের কমিটিগুলো ডোনারের পরিচয়, উৎপত্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক যাচাই করে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট এলাকার চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়, যাতে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনিয়ম না থাকে।
১৯টি বিশেষায়িত বিভাগের অংশগ্রহণ
অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, একটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য রোগী ও ডোনারকে প্রস্তুত করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। চিকিৎসাগত সামঞ্জস্য, আইনগত অনুমোদন, মানসিক প্রস্তুতি এবং বড় ধরনের লজিস্টিক সমন্বয় ছাড়া এ ধরনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব নয়।
তার মতে, লিভার প্রতিস্থাপন কোনো একজন সার্জনের একক সাফল্য নয়। সার্জন, হেপাটোলজিস্ট, অ্যানেসথেটিস্ট, নার্স, রেসিডেন্ট চিকিৎসক এবং ইনফেকশন কন্ট্রোল টিমসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
বিএমইউ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ছয়টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি বিশেষায়িত বিভাগ অংশ নিয়েছে। এ কাজে ভারতের হায়দ্রাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজি (এআইজি) হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ দল কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে।
সম্প্রতি লিভার প্রতিস্থাপন করা জোসনা বেগম বর্তমানে সুস্থভাবে চলাফেরা করছেন। তার ছেলে মো. সাজ্জাদ ছিলেন লিভারের দাতা। সাজ্জাদ জানান, অস্ত্রোপচারের পরও তার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে বাংলাদেশে লিভার প্রতিস্থাপন সম্ভব। অস্ত্রোপচারের জন্য তাদের প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছে।
দেশে বিশেষজ্ঞ তৈরির পরিকল্পনা
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে বিএমইউর উপাচার্য বলেন, দ্রুতই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সার্জন তৈরি করা সম্ভব হবে। তারা পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে লিভার প্রতিস্থাপনের মতো জটিল অস্ত্রোপচার পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
দেশে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএমইউতে নিয়মিতভাবে অস্ত্রোপচার চালানো গেলে দেশের মানুষের মধ্যে এ চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে আস্থার জায়গা তৈরি হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র দাস, অধ্যাপক ডা. সাইফ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমসহ ট্রান্সপ্ল্যান্ট কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি