
ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের সন্দেহে নৌযান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক বেন সল।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় ৬৮টি নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় অন্তত ২২৩ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আত্মরক্ষার যুক্তি প্রত্যাখ্যান জাতিসংঘের
যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযানকে ‘নার্কো-সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ঘোষিত ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের অংশ হিসেবেই এসব অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনে এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি এবং জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড সম্ভাব্যভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র দুই দিন আগে ক্যারিবীয় সাগরে একটি নৌযানে হামলা চালিয়ে চারজনকে হত্যার কথা জানিয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এসব অভিযানের সমালোচনা করে এগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার ভিডিও প্রকাশ করলেও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের কী ধরনের প্রমাণ ছিল, সে বিষয়ে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে।
মাদক পাচারকে ‘সশস্ত্র হামলা’ বলা যাবে না
বেন সলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মাদক পাচারকে এমন ‘সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে গণ্য করা যায় না, যার জবাবে কোনো রাষ্ট্র আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইনে আত্মরক্ষার যুক্তি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যেসব গোষ্ঠীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেমন ভেনেজুয়েলাভিত্তিক ট্রেন দে আরাগুয়া, তারা ভেনেজুয়েলা সরকারের সশস্ত্র প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে—এমন কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাণঘাতী হামলার বিকল্প ছিল
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন নৌযানগুলোকে প্রাণঘাতী হামলার পরিবর্তে সমুদ্রে আটক করার মতো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত হতে পারে বলে স্বীকার করেছেন।
আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে প্রতিবেদনে বলা হয়, কেবল আসন্ন ও গুরুতর হুমকির ক্ষেত্রে শেষ বিকল্প হিসেবে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযানে সেই শর্ত পূরণ হয়নি বলে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মিত ও ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় নীতির আওতায় এসব হামলা পরিচালিত হয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ায় ঘটনাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
এ কারণে এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, দায়ীদের—রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বসহ—বিচারের আওতায় আনা এবং নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন
হামলাগুলোর বৈধতার পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘের প্রতিবেদন।
এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে কোকেন জব্দের পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অধিকাংশ কোকেন বড় কনটেইনার জাহাজে পরিবহন করা হয়, যেগুলো খুব কমই তল্লাশির মুখে পড়ে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ছোট নৌযানগুলোই প্রধান লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে অতিমাত্রায় মাদকসেবনে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ফেন্টানিল ও অন্যান্য ওপিওয়েডের বিস্তার ঠেকাতেও এসব হামলার কার্যকর ভূমিকা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এসব মাদক সাধারণত ভেনেজুয়েলা থেকে সমুদ্রপথে পাচার করা হয় না।
অভিযানের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, নিম্নস্তরের সন্দেহভাজনদের হত্যা করলে মাদক চক্রের মূল নেতৃত্বকে বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টা দুর্বল হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসব সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এই অর্থ প্রমাণভিত্তিক আইন প্রয়োগ, জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে ব্যয় করা যেত বলেও প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি