
ভোরের ঘাসে শিশির, বিকেল নামতেই কুয়াশার মিহি পর্দা, ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা বাতাস আর চা-বাগানের সবুজ পাতায় মুক্তোর মতো ঝলমলে জলকণা—প্রকৃতির বদলে যাওয়া এই রূপ জানান দিচ্ছে ঋতু পরিবর্তনের।
চায়ের রাজ্যখ্যাত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের গ্রামীণ জনপদ, চা-বাগান, পাহাড়ি এলাকা ও মেঠোপথে এখন হেমন্তের আগমনী আবেশ। শেষরাত ও ভোরে অনুভূত হচ্ছে বাড়তি শীতলতা। অনেক পরিবার এরই মধ্যে বের করে রাখছে হালকা কম্বল, চাদর ও শীতের পোশাক।
শনিবার সকালে কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুরসহ আশপাশের এলাকায় দেখা যায়, ভোরের আলো ফুটতেই চা-বাগানের সারি সারি পাতায় জমে থাকা শিশির সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে, সবুজ পাতার ওপর ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মুক্তোদানা।
কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্যের উঁকি দেওয়া আর ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা নরম রোদে তৈরি হচ্ছে এক মায়াবী পরিবেশ। প্রকৃতির এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে কমলগঞ্জের মাধবপুর, রহিমপুর, বালিগাঁও, মাগুরছড়া ও বিভিন্ন খাসিয়া পুঞ্জি এলাকায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকায় অন্য অনেক জায়গার তুলনায় কুয়াশা কিছুটা আগেই নামছে। বিকেল গড়াতেই ধানক্ষেত ও মেঠোপথে দেখা মিলছে হালকা কুয়াশার। ভোরে শিশিরভেজা ঘাস, পাখির ডাক আর গঙ্গা ফড়িংয়ের উড়াউড়ি মিলিয়ে গ্রামীণ প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজেছে।
ঋতুর এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রকৃতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। কৃষকের মাঠেও শুরু হয়েছে শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি। কমলগঞ্জের আদমপুর, ইসলামপুর, রানীবাজার, ঘোড়ামারা, মাধবপুর, মাঘমাড়া, বালিগাঁও, পতনঊষার ও শমসেরনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি প্রস্তুত করছেন কৃষকেরা।
কোথাও চলছে বীজ বপন, কোথাও আবার চারা পরিচর্যার কাজ। শিম, লালশাক, টমেটো, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মূলাসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির আবাদ ঘিরে কৃষকের ব্যস্ততা বাড়ছে। ভালো ফলন ও ন্যায্য দামের প্রত্যাশায় নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী মো. জিল্লুর রহমান তামিম বলেন, ‘প্রকৃতিতে শীত শীত ভাব এসে গেছে। ভোরে ঘাস ভেজা থাকে, বাতাস ঠাণ্ডা লাগে। চাদর গায়ে দিতে হয়।’
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চা-বাগানগুলোতে ঋতুবদলের সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের ঢাল, সারি সারি সবুজ চা-গাছ, কুয়াশায় ঢাকা পথ আর নরম সকালের আলো মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে মন ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্য। দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে গেলেও প্রকৃতিতে থেকে যাচ্ছে সতেজতার ছাপ।
চা-বাগানের সবুজের সঙ্গে শিশিরের ঝিলিক আর পাহাড়ি এলাকার কুয়াশা মিলিয়ে মৌলভীবাজারে এখন এক অন্যরকম আবহ। প্রকৃতির এই পরিবর্তন স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নিয়ে আসছে নতুন অনুভূতি।
সব মিলিয়ে কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলে এখন ঋতু পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ। একদিকে শিশিরভেজা ঘাস, কুয়াশার কোমলতা ও ঠাণ্ডা বাতাস; অন্যদিকে শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকের ব্যস্ততা—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে, দরজায় কড়া নাড়ছে হেমন্ত। আর হেমন্তের হাত ধরেই ধীরে ধীরে চায়ের রাজ্যে নামবে শীত।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি