
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক বাজার থেকে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমে গেছে। ফলে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছেন। এতে আফ্রিকার এলএনজি উৎপাদক দেশগুলোর সামনে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংককে অনুষ্ঠিত গ্যাসটেক জ্বালানি সম্মেলনে বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি শেলের পক্ষ থেকে এই সরবরাহ ঘাটতির হিসাব তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
বিশ্ববাজার থেকে হারিয়ে যাওয়া এলএনজির পরিমাণ আফ্রিকার পুরো মহাদেশ ২০২৫ সালে যে পরিমাণ রফতানি করেছিল, তার কাছাকাছি। গত বছর আফ্রিকার দেশগুলো মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৯৮ লাখ টন এলএনজি রফতানি করেছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে বিঘ্নের মাত্রা কতটা বড়, তা এই তুলনা থেকে স্পষ্ট।
হরমুজ প্রণালিতে আটকে সরবরাহ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজি রফতানির বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট।
বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের রফতানির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে এলএনজির দামেও। এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে। সংঘাত শুরুর আগে এই দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার।
আফ্রিকার দিকে নজর ক্রেতাদের
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা এমন উৎপাদক দেশের দিকে নজর দিচ্ছেন, যাদের এলএনজি পরিবহনে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে হয় না।
এ ক্ষেত্রে নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মিসর, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ও মোজাম্বিকের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এসব দেশের কয়েকটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি পাঠাতে হরমুজ অতিক্রমের প্রয়োজন নেই। আলজেরিয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে পাইপলাইন ও এলএনজি—দুই ধরনের সরবরাহ ব্যবস্থাও রয়েছে।
নাইজেরিয়া-আলজেরিয়ার সক্ষমতা
২০২৫ সালে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় এলএনজি রফতানিকারক ছিল নাইজেরিয়া। দেশটি প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ টন এলএনজি রফতানি করে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আলজেরিয়া রফতানি করে প্রায় ৯৭ লাখ টন।
দুই দেশ মিলে গত বছর প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টন এলএনজি রফতানি করলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বর্তমানে বাজারে অনুপস্থিত প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টনের তুলনায় এই পরিমাণ কম। অর্থাৎ আফ্রিকার দেশগুলোর পক্ষে স্বল্প সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো সরবরাহ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
বাড়তি চাহিদার সুফল পেতে সময় লাগবে
এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় আফ্রিকার উৎপাদকদের জন্য বাড়তি রাজস্বের সুযোগ তৈরি হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল পরিমাণ রফতানি বাড়াতে পারবে না। কারণ আফ্রিকার অনেক এলএনজি কার্গো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আগেই বিক্রি হয়ে থাকে।
এ ছাড়া বেশ কিছু পুরোনো উৎপাদনকেন্দ্র অবকাঠামোগত সমস্যা, গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও উৎপাদন সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। নতুন প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোও এখনো নির্মাণাধীন।
নাইজেরিয়ার ট্রেন-৭ প্রকল্প
নাইজেরিয়ার এলএনজি উৎপাদন বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো নাইজেরিয়া এলএনজির ট্রেন-৭ সম্প্রসারণ প্রকল্প। প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্প ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটি চালু হলে নাইজেরিয়া এলএনজির উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টন থেকে বেড়ে ৩ কোটি টনে উন্নীত হওয়ার কথা। তবে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় এর সুফল পেতে আরও সময় লাগবে।
নতুন সরবরাহের সম্ভাবনা
সেনেগাল, মৌরিতানিয়া ও মোজাম্বিকসহ আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশে এলএনজি প্রকল্প এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্প ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারে আফ্রিকার অংশ বাড়াতে পারে।
তবে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্পন্ন করতে সময় লাগবে। ফলে স্বল্পমেয়াদে আফ্রিকার বড় সুযোগ হতে পারে বিদ্যমান অতিরিক্ত বা চুক্তিবহির্ভূত কার্গো তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করা।
দীর্ঘমেয়াদে বদলাতে পারে সরবরাহের চিত্র
শেলের হিসাব অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে ১৫ কোটি থেকে ২০ কোটি টন নতুন এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। তবে এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে এলএনজির দাম তুলনামূলক উঁচু থাকতে পারে।
এতে অতিরিক্ত বা চুক্তিবহির্ভূত কার্গো থাকা আফ্রিকান উৎপাদকদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা সরবরাহের উৎস ও পরিবহনপথ আরও বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগ নিতে পারেন।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু এলএনজির স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ ও দামে প্রভাব ফেলছে না; দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহের মানচিত্রেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। আফ্রিকার উৎপাদক দেশগুলো এতে নতুন বাজার ও বাড়তি রাজস্বের সুযোগ পেলেও মধ্যপ্রাচ্যের হারানো বিপুল সরবরাহ দ্রুত পূরণ করার সক্ষমতা তাদের এখনো নেই।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ