
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, খসড়ায় থাকা কিছু অস্পষ্ট ও বিস্তৃত বিধানের অপপ্রয়োগ হলে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আবারও হয়রানির শিকার হতে পারে। বিশেষ করে বাতিল হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত কিছু বিষয়বস্তু নতুন আইনে যুক্ত হওয়ায় অতীতের অভিজ্ঞতা ফিরে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় এসব উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। সভায় গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, সাংবাদিক নেতা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা অংশ নেন।
সভায় গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্টরা বলেন, শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করলেই সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বরং আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাঁদের মতে, কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে যাতে সাংবাদিকদের হয়রানি, মামলা বা গ্রেপ্তারের মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য আইনে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা থাকা প্রয়োজন।
ডেইলি স্টারের কনসালট্যান্ট এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত আইনে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির মামলা করার কথা থাকলেও বাস্তবে তৃতীয় পক্ষের করা মামলাও গ্রহণের ঘটনা দেখা গেছে। তাঁর মতে, আইন কঠোর করার পাশাপাশি এর অপপ্রয়োগের ঝুঁকি কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেটিই বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
প্রস্তাবিত আইনে মোবাইল কোর্টকে ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। তাঁর আশঙ্কা, সাইবার অপরাধের মতো জটিল বিষয়ে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হলে অপপ্রয়োগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, সাংবাদিকেরা অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের কারণে ভুক্তভোগী হয়েছেন। তাই নতুন আইনে মানহানি, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, অশ্লীলতা এবং গুজব-অপতথ্যের মতো বিষয়গুলো কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বিশেষ করে প্রস্তাবিত আইনের ২৫ ও ২৬ ধারার কথা উল্লেখ করে বলেন, মানহানির মতো বিষয়কে গুরুতর সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করলে সেটির অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অপতথ্যের সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও ব্যাপক হওয়ায় সংবাদমাধ্যমের কাজের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী প্রস্তাবিত সংশোধনীর ৮(২) ধারার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বক্তব্যের মতো বিষয় যুক্ত থাকলে রাজনৈতিক বক্তব্য ও সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে সময় টিভির সিইও জুবায়ের বাবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে মেটাকে আইনের আওতায় আনার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে সাইবার সুরক্ষার উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে তিনি মত দেন। পাশাপাশি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
আমার দেশের যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত আইনে সুকৌশলে ডিজিটাল আইনের গণমাধ্যমবিরোধী কিছু বিষয়বস্তু যুক্ত করা হয়েছে। এতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সরকারের বক্তব্য
পরামর্শ সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণমাধ্যম ও অনলাইন গণমাধ্যমকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সমাজকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই আইন প্রণয়ন করা হবে, যাতে এর অপপ্রয়োগ না হয়।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, আইন সংশোধনের বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এমনভাবে আইন করা হবে, যাতে গণমাধ্যমসহ কোনো পক্ষের ওপর এর অপপ্রয়োগ না হয়। সরকারের মূল উদ্দেশ্য সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করা।
সভাপতির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, বৃহস্পতিবারের সভায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অংশীজনদের মতামত নিয়ে আরও আলোচনা করা হবে। এ বিষয়ে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর আবারও সভা অনুষ্ঠিত হবে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের মানুষকে সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সরকার নীতিগতভাবে স্বীকার করে। তবে সেই সুরক্ষা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে অংশীজনদের পরামর্শ বিবেচনায় নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও মেটাকে জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। আর তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, এটি মূলত সাইবার সুরক্ষা আইন; এতে প্রিন্ট মিডিয়ার বিষয় নেই।
সভায় সাংবাদিক ও গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়াও জাতীয় প্রেস ক্লাব, বিভিন্ন সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি