
ঢাকার ব্যস্ত কর্মদিবসের সকালে ফ্যাশন নিয়ে বড় কোনো বক্তব্য দেওয়ার কথা ভাবেন না তাসফিয়া মুমতারিন। সামনে অফিস, মিটিং, ক্লায়েন্ট ভিজিট, কয়েক ঘণ্টা ডেস্কে কাজ এবং সন্ধ্যায় নাচের অনুশীলন। এমন ব্যস্ত দিনের মধ্যে প্রশ্নটা খুবই বাস্তব—একটি শাড়ি কি সত্যিই এত কিছু সামলে উঠতে পারে?
তাসফিয়ার মতে, শাড়ি পরাকে যদি সবসময় ‘সাজগোজের’ বিষয় হিসেবে না দেখা হয়, তাহলে নিয়মিত শাড়ি পরা অনেক সহজ। আরামদায়ক ব্লাউজ, ফ্ল্যাট জুতা, বড় একটি অফিস ব্যাগ ও সামান্য গয়না দিয়ে একটি সুতি শাড়ি পরা গেলে সেটি বিশেষ অনুষ্ঠানের পোশাক না হয়ে প্রতিদিনের পোশাক হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গাতেই নতুন করে ভাবা যেতে পারে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে।
বাংলার পোশাকের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত টাঙ্গাইল শাড়ি এখনো অনেকের আলমারিতে বিশেষ দিনের পোশাক হিসেবেই পড়ে থাকে। পয়লা বৈশাখ, পূজা, বিয়ে, অফিসের অনুষ্ঠান কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন—এসব উপলক্ষেই সাধারণত টাঙ্গাইল শাড়ি বের করা হয়। অথচ হালকা, আরামদায়ক ও আবহাওয়াসম্মত হওয়ায় এটি বাংলাদেশের দৈনন্দিন পোশাক হিসেবেও অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
ঐতিহ্যের সঙ্গে ব্যবহারিকতা
টাঙ্গাইল শাড়ির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর সূক্ষ্ম বুনন, স্থানীয় নকশা ও বৈচিত্র্যময় মোটিফ। তুলা, রেশম কিংবা পাট—বিভিন্ন উপকরণে তৈরি হতে পারে এই শাড়ি।
২০২৫ সালে ইউনেসকো টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি বুননশিল্পকে Intangible Cultural Heritage of Humanity-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাসাক ও ঝোলা সম্প্রদায়ের তাঁতিদের হাতে টিকে থাকা এই বুনন ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে।
তবে কোনো পোশাকের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বেশি হলেই সেটিকে শুধু বিশেষ দিনের জন্য তুলে রাখতে হবে—এমন নয়। বরং টাঙ্গাইল তাঁতের অনেক বৈশিষ্ট্যই একে নিয়মিত ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে। হালকা সুতি কাপড়, বাতাস চলাচলের সুবিধা এবং তুলনামূলক সহজ যত্ন—সব মিলিয়ে গরম ও আর্দ্র বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এটি বেশ কার্যকর।
ফ্যাশন ডিরেক্টর ও স্টাইলিস্ট সোনিয়া ইয়াসমিন ইশার মতে, টাঙ্গাইল শাড়ির আরেকটি শক্তি হলো এর সহজলভ্যতা ও বৈচিত্র্য। দৈনন্দিন ব্যবহারের তুলনামূলক সাশ্রয়ী শাড়ির পাশাপাশি অত্যন্ত দামি ও নকশাদার টাঙ্গাইলও রয়েছে। কিছু শাড়ির দাম এক লাখ টাকারও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ একই তাঁত ঐতিহ্য থেকে তৈরি পোশাক একদিকে যেমন প্রতিদিনের জন্য ব্যবহার করা যায়, অন্যদিকে তেমনি বিয়ে বা পার্টির মতো অনুষ্ঠানেও পরা যায়।
সমস্যা শাড়িতে, নাকি আমাদের ধারণায়?
তরুণীদের অনেকেই নিয়মিত শাড়ি না পরার কারণ হিসেবে বলেন—শাড়ি পরা কঠিন, বেশি আনুষ্ঠানিক, যাতায়াতে অসুবিধাজনক কিংবা সারাদিন পরে থাকা অস্বস্তিকর।
এর কিছু বাস্তব কারণ অবশ্যই আছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটি শাড়ির চেয়ে আমরা শাড়িকে যেভাবে পরার কথা ভাবি, তার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে ব্লাউজ তৈরি, গয়না নির্বাচন, নিখুঁত কুঁচি, আঁচল ঠিক রাখা, চুল ও মেকআপ—সব মিলিয়ে একটি সাধারণ সুতি শাড়িও মুহূর্তের মধ্যে ‘অনুষ্ঠান’ হয়ে যায়।
এই ধারণা বদলানোর পরামর্শ দিয়েছেন সোনিয়া ইয়াসমিন ইশা। তাঁর মতে, টাঙ্গাইল শাড়ি প্রায় যেকোনো পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্নভাবে স্টাইল করা যায়।
অফিসে শাড়ির ওপর ব্লেজার পরা যেতে পারে। শার্টকে নট করে ব্লাউজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। শীতকালে সাধারণ ব্লাউজের বদলে হাই-নেক বা কালো টার্টলনেক পরা যেতে পারে। এর সঙ্গে বেল্ট বা জ্যাকেট যোগ করলেও তৈরি হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি লুক।
অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী শাড়ি পরলেই যে সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী সাজে থাকতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
ভালো শাড়ি তুলে রাখার অভ্যাস বদলানো দরকার
বাংলাদেশে পোশাক জমিয়ে রাখার একটি প্রবণতা আছে। সুন্দর শাড়িটি অফিসে পরা হয় না, কারণ সেটি ‘খুব ভালো’। আরেকটি শাড়ি রাখা থাকে বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের জন্য। শেষ পর্যন্ত বছরের পর বছর আলমারিতে পড়ে থাকা একাধিক শাড়ি হয়তো জীবনে দু-একবারের বেশি পরাই হয় না।
যোগাযোগ পেশার সঙ্গে যুক্ত নাফিসা রাইদাহ মনে করেন, একটি শাড়িকে বিভিন্নভাবে বারবার পরতে পারার সুযোগ থাকলে শাড়ির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে।
একই টাঙ্গাইল শাড়ি সোমবার অফিসে পরা যেতে পারে, এক মাস পর বন্ধুদের সঙ্গে লাঞ্চে অন্য ব্লাউজের সঙ্গে পরা যেতে পারে, আবার ভিন্ন গয়না দিয়ে পারিবারিক ডিনারেও পরা যায়।
এটি টেকসই ফ্যাশনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব পোশাক মানে শুধু পোশাকটি কী দিয়ে তৈরি তা নয়; আমরা পোশাকটি কতটা ব্যবহার করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সাধারণ টাঙ্গাইল শাড়ি দিয়েই একাধিক লুক তৈরি করা সম্ভব। অফিসে সাদা শার্টের সঙ্গে, দিনে সাধারণ কটন ব্লাউজের সঙ্গে, রাতে স্লিভলেস ব্লাউজ ও রুপালি গয়নার সঙ্গে কিংবা শীতকালে জ্যাকেটের সঙ্গে একই শাড়ি পরা যায়।
একই পোশাক বারবার পরা কোনো ব্যর্থতা নয়—বরং সেটিই হওয়া উচিত।
নতুন টাঙ্গাইল একটু শক্ত লাগতে পারে
নতুন সুতি টাঙ্গাইল শাড়ি অনেক সময় কিছুটা শক্ত বা ফুলে থাকা মনে হতে পারে। এটিও নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি ছোট বাধা।
তবে কয়েকবার ধোয়ার পর কাপড় সাধারণত নরম হয়ে আসে। ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে শাড়িটি আরও পরিচিত ও আরামদায়ক হয়ে ওঠে। কুঁচি করা সহজ হয়, চলাফেরাও স্বচ্ছন্দ লাগে।
কর্মদিবসে শাড়ি পরার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব বিষয়ও কাজে আসে—কুঁচি ভালোভাবে পিন করা, আঁচল খুব বড় না রাখা, হাঁটার উপযোগী জুতা পরা, অতিরিক্ত ভারী গয়না এড়িয়ে চলা এবং এমন ব্লাউজ বেছে নেওয়া যাতে হাত সহজে নড়াচড়া করা যায়।
শাড়ি পরলেই এমনভাবে সাজতে হবে, যেন সবসময় কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসাই মূল কথা।
টাঙ্গাইলের বর্ডারই হোক সাজের মূল আকর্ষণ
টাঙ্গাইল শাড়ির নকশায় রয়েছে বিস্তর বৈচিত্র্য। কোথাও চওড়া ও চোখে পড়ার মতো বর্ডার, কোথাও সরু বর্ডার, আবার কোনো শাড়িতে শরীরজুড়ে মোটিফই মূল আকর্ষণ।
তাই প্রতিদিনের শাড়ি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে খুব বেশি সাজসজ্জার প্রয়োজন নেই। সুন্দর একটি বর্ডার থাকলে ভারী নেকলেসের প্রয়োজন পড়ে না। ছোট মোটিফের শাড়ির সঙ্গে সাধারণ ব্লাউজই যথেষ্ট।
কালো, সাদা, বেইজ, ইন্ডিগোর মতো সহজে মেলানো যায় এমন রঙের ব্লাউজ রাখলে প্রতিটি শাড়ির জন্য নতুন করে ব্লাউজ বানানোর প্রয়োজনও কমে যায়।
উদ্দেশ্য টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমা পোশাকের মতো দেখানো নয়। বরং ঐতিহ্যবাহী এই পোশাকটি কীভাবে পরতে হবে, সেই অপ্রয়োজনীয় নিয়মগুলো একটু শিথিল করা।
টাঙ্গাইল শাড়িকে সংরক্ষণ নয়, ব্যবহার করতে হবে
টাঙ্গাইল শাড়ি এর মধ্যেই প্রমাণ করেছে যে এটি সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। তাঁতিরা নতুন রং, নকশা ও মোটিফের মাধ্যমে ক্রমাগত পরিবর্তিত রুচির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন।
ইউনেসকোর স্বীকৃতি টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প, কারিগর ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশেও টাঙ্গাইল শাড়ি নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক বা GI পণ্য হিসেবে স্বীকৃত।
তবে এই ঐতিহ্যকে সম্মান করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হয়তো শুধু প্রদর্শনী বা বিশেষ অনুষ্ঠানে শাড়িটি তুলে রাখা নয়। বরং কোনো এক কর্মদিবসের সকালে আলমারি খুলে অন্য পোশাকের পাশে টাঙ্গাইল শাড়িটিও বেছে নেওয়া।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সুতি ও আরামদায়ক পোশাকের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এখন প্রয়োজন তাদের সামনে টাঙ্গাইল শাড়ির সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরা—কীভাবে একই শাড়ি অফিস, বন্ধুর সঙ্গে দেখা, দুপুরের খাবার কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে ভিন্নভাবে পরা যায়।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম টাঙ্গাইলের তাঁতে তৈরি হয়েছে অসাধারণ সব পোশাক। হয়তো এর পরের অধ্যায়টি আরও সাধারণ—টাঙ্গাইল শাড়িকে বিশেষ দিনের আলমারি থেকে বের করে সপ্তাহের প্রতিদিনের পোশাক বানানো।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি