
উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নৌবহরে ‘ক্যাং কন’ নামের একটি নতুন যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করেছে। দেশটির নেতা কিম জং উন বলেছেন, সামুদ্রিক ও জলসীমার নিরাপত্তা এবং দেশের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। শত্রুর বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা এবং পারমাণবিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও জাহাজটিকে ব্যবহার করা হতে পারে বলে উত্তর কোরিয়ার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
উত্তর কোরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ওয়ানসান বন্দরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যুদ্ধজাহাজটি নৌবহরে যুক্ত করা হয়। কোরীয় যুদ্ধের সময় নিহত উত্তর কোরিয়ার সামরিক নেতা ক্যাং কনের নামে জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে কিম জং উন বলেন, জাহাজটি উত্তর কোরিয়ার আত্মমর্যাদা, অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে কাজ করবে।
কিম বলেন, সমুদ্র ও পানির নিচে নিজেদের সার্বভৌমত্ব কার্যকর করার সময় এসেছে। বিশেষ করে কোরীয় উপদ্বীপের পূর্বদিকে সমুদ্র ও আশপাশের জলসীমায় উত্তর কোরিয়া ক্রমাগত হুমকির মধ্যে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব হুমকি মোকাবিলায় নৌবাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর জোর দেন উত্তর কোরীয় নেতা।
‘ক্যাং কন’ যুদ্ধজাহাজে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি উত্তর কোরিয়া। তবে কেসিএনএ জানিয়েছে, জাহাজটিতে জুনে উদ্বোধন করা প্রায় ৫ হাজার টন ওজনের ‘চো হিয়ন’ যুদ্ধজাহাজে ব্যবহৃত একই ধরনের অস্ত্রব্যবস্থা রয়েছে। এর আগে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, চো হিয়ন শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে।
ক্যাং কনের আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার ইতিহাসও বেশ ঘটনাবহুল। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথমবার উদ্বোধনের সময় জাহাজটি আংশিকভাবে উল্টে যায়। পরে মেরামত করে জুনে আবার পানিতে নামানো হয়। এরপর আরও মেরামত ও সমুদ্রপথে পরীক্ষামূলক চলাচলের পর চলতি বছরের জুলাইয়ে জাহাজটির অস্ত্র পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। এবার সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবহরে যুক্ত করা হলো।
কেসিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী আট মাসের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনী শক্তিশালী করার আরও একটি ধাপ দেখানো হবে বলে কিম জং উন জানিয়েছেন। তবে সেই পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে পূর্ব উপকূলে নতুন নৌঘাঁটি নির্মাণ, নতুন নৌ ইউনিট গঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণির আরও যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে পিয়ংইয়ং।
উত্তর কোরিয়া নিজেদের একটি অপরিবর্তনীয় পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে। দেশটির বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কিম জং উনও অভিযোগ করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক কর্মকাণ্ড কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ক্যাং কনকে নৌবহরে যুক্ত করার ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান পাঁচ দিনের যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। ‘ফ্রিডম এজ’ নামের এ মহড়া দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণের জলসীমায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, মহড়াটি প্রতিরক্ষামূলক এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলা ও আঞ্চলিক শান্তি-স্থিতিশীলতা জোরদারের উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছে।
তবে উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের এ ধরনের যৌথ সামরিক মহড়ার সমালোচনা করে আসছে। পিয়ংইয়ং এগুলোকে বেপরোয়া শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখছে। ফলে নতুন যুদ্ধজাহাজ নৌবহরে যুক্ত করা এবং একই সময়ে মিত্র দেশগুলোর যৌথ সামরিক মহড়া—দুই ঘটনাই কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনার নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি