
রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, বাংলাদেশে এর মানবিক ও নিরাপত্তাঝুঁকি তত বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকট শুধু শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার বিষয় নয়, এর সঙ্গে মাদক চোরাচালান, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িয়ে পড়ছে। তাই সংকটকে অনির্দিষ্টকাল মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সামাল না দিয়ে দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রোববার রাজধানীর রমনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘রোহিঙ্গা সংকট: নতুন চ্যালেঞ্জসমূহ এবং টেকসই কৌশল’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব মত উঠে আসে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) এ আলোচনার আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান যত বিলম্বিত হবে, সামগ্রিক সংকট তত গভীর হবে। এতে শুধু স্থানীয় জনগোষ্ঠীই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, রোহিঙ্গারাও দীর্ঘমেয়াদে আরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়বেন। তাই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল মানবিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা মাত্রা যুক্ত হয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে নারী নির্যাতন বাড়ার পাশাপাশি মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে বর্তমান সরকার বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
তিনি আরও বলেন, সংকট মোকাবিলায় শুধু বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, অনির্দিষ্টকাল জরুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকার পরিবর্তে প্রত্যাবাসন ও প্রত্যাবর্তনকেন্দ্রিক একটি রূপান্তর কৌশলের দিকে এগোতে হবে। তবে মানবিক সহায়তা বন্ধ করার সুযোগ নেই। এই সহায়তাকে সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সমাধানের পথে একটি সেতু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রকৃত প্রত্যাবাসনের দিকে এগোতে রোহিঙ্গাদের যাচাইপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই যাচাইপ্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার ভিত্তিতে তা দ্রুত শেষ করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে শিবিরে জন্ম নেওয়া এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দীর্ঘদিন ধরে অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর আরও কার্যকর সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের রোহিঙ্গা শিবিরের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। শিবির পরিচালনায় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনায় সাবেক সামরিক কর্মকর্তারাও রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর কৌশলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। মিয়ানমারকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া এবং বাংলাদেশের কৌশলগত ধৈর্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে—এমন অবস্থান তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা একশনএইডের এ দেশীয় পরিচালক ফারাহ কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও দুর্যোগঝুঁকির সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বাংলাদেশ বহন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশ, অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। সময় যত বাড়ছে, সংকটের ব্যবস্থাপনা তত জটিল হয়ে উঠছে। তাই মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি