
স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ব্যক্তিগত ছবি, গুরুত্বপূর্ণ নথি, ব্যাংকিং তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টসহ নানা ধরনের সংবেদনশীল তথ্য ফোনে সংরক্ষিত থাকে। ফলে ফোনের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের হাতে চলে গেলে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ও নিরাপত্তাজনিত ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
অনেক সময় ফোন হ্যাক হওয়ার বিষয়টি সরাসরি বোঝা যায় না। তবে ফোনের স্বাভাবিক আচরণে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন কয়েকটি লক্ষণ একসঙ্গে দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা উচিত।
প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট অল অ্যাবাউট কুকিজের এক প্রতিবেদনে ফোন হ্যাক হওয়ার সম্ভাব্য পাঁচটি লক্ষণের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
১. হঠাৎ ফোন ধীর হয়ে যাওয়া
নতুন বা তুলনামূলক ভালো অবস্থার ফোন হঠাৎ ধীর হয়ে গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। অস্বাভাবিকভাবে ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া, ফোন অতিরিক্ত গরম হওয়া, অ্যাপ আটকে যাওয়া কিংবা বারবার পর্দা জমে যাওয়াও সন্দেহের কারণ হতে পারে।
তবে শুধু ফোন ধীর হয়ে যাওয়া বা ব্যাটারি দ্রুত শেষ হওয়ার অর্থই যে ফোন হ্যাক হয়েছে, তা নয়। পুরোনো ব্যাটারি, পর্যাপ্ত স্টোরেজ না থাকা কিংবা সফটওয়্যার সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে। তাই অন্যান্য লক্ষণও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২. আপনার অজান্তে অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড
আপনি কোনো বার্তা পাঠাননি, অথচ পরিচিতরা জানাচ্ছেন যে আপনার নম্বর থেকে অদ্ভুত বার্তা বা সন্দেহজনক লিংক পেয়েছেন—তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে আপনার পরিচিতদের কাছে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করতে পারে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার অজান্তে পোস্ট, কমেন্ট বা অন্য কোনো কার্যক্রম দেখা গেলেও দ্রুত অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
৩. হঠাৎ ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া
আপনি প্রতিদিনের মতোই ফোন ব্যবহার করছেন, কিন্তু হঠাৎ মোবাইল ডেটার ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে—এমন হলে সতর্ক হওয়া দরকার।
কোনো সন্দেহজনক অ্যাপ পেছনে থেকে তথ্য পাঠাচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। ফোনের সেটিংসে গিয়ে কোন অ্যাপ কতটা মোবাইল ডেটা ব্যবহার করছে, সেটিও দেখা সম্ভব। অস্বাভাবিক ডেটা ব্যবহারের কারণ শনাক্ত করতে পারলে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
৪. অচেনা ডিভাইস বা অ্যাকাউন্টে প্রবেশ
আপনার গুগল, অ্যাপল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে কোন কোন ডিভাইস যুক্ত আছে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা ভালো।
অপরিচিত কোনো ডিভাইস বা অবস্থান থেকে অ্যাকাউন্টে লগইন দেখা গেলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। প্রয়োজন হলে ওই ডিভাইস থেকে অ্যাকাউন্ট সাইন-আউট করে দ্রুত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের নিরাপত্তা বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু করা উচিত।
৫. নিজের অজান্তে নতুন অ্যাপ
ফোনে এমন কোনো অ্যাপ দেখতে পেলেন, যেটি আপনি নিজে ইনস্টল করেননি? বিষয়টি অবহেলা করবেন না।
বিশেষ করে অপরিচিত উৎস থেকে ইনস্টল করা অ্যাপ ফোনের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অ্যাপটির পরিচয়, উৎস ও প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত না হলে সেটি সরিয়ে দেওয়া নিরাপদ। পাশাপাশি ফোনে অস্বাভাবিক কোনো অ্যাপের অনুমতি দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা উচিত।
যেভাবে ফোন হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে
সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক
ফোনে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ঢোকার অন্যতম পথ হতে পারে সন্দেহজনক লিংক। অপরিচিত বার্তা, ই-মেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠানো অজানা লিংকে ক্লিক করলে ফোনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে পুরস্কার, জরুরি অ্যাকাউন্ট যাচাই, টাকা পাওয়ার দাবি কিংবা ভয় দেখিয়ে পাঠানো লিংকে ক্লিক করার আগে ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ক্ষতিকর অ্যাপ ব্যবহার
অফিশিয়াল অ্যাপ স্টোরের বাইরে থেকে অ্যাপ ডাউনলোড ও ইনস্টল করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। অনেক ক্ষতিকর অ্যাপ স্বাভাবিক বা জনপ্রিয় অ্যাপের মতো দেখতে হতে পারে। এসব অ্যাপ ইনস্টল করার পর ব্যক্তিগত তথ্য, ফাইল বা অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তাই সম্ভব হলে অ্যাপের নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করে ইনস্টল করা উচিত এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ফোনে রাখা থেকে বিরত থাকা ভালো।
ফোনের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দেওয়া
দুর্বল বা একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করা নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে ফোনের অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ নিয়মিত আপডেট না করলেও নিরাপত্তার দুর্বলতা তৈরি হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং দুই ধাপের নিরাপত্তা চালু রাখা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
অনিরাপদ ফ্রি ওয়াই-ফাই
ক্যাফে, বিমানবন্দর, হোটেল কিংবা অন্য কোনো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সময়ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সাইবার অপরাধীরা কখনো কখনো ভুয়া ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক তৈরি করে ব্যবহারকারীদের সংযুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। তাই অজানা নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে লগইন বা সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকা উচিত।
ফোন নিরাপদ রাখতে যা করবেন
ফোনের অপারেটিং সিস্টেম এবং সব অ্যাপ নিয়মিত হালনাগাদ রাখুন। গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন এবং সম্ভব হলে দুই ধাপের নিরাপত্তা চালু করুন।
অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা এবং অবিশ্বস্ত উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত ফোনে ইনস্টল করা অ্যাপ, অ্যাপগুলোর অনুমতি, অ্যাকাউন্টে যুক্ত ডিভাইস এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের হিসাব পরীক্ষা করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি লক্ষণ দেখেই ধরে নেওয়া যাবে না যে ফোন হ্যাক হয়েছে। তবে একসঙ্গে একাধিক অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা উচিত। সন্দেহ হলে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলোর পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, অচেনা ডিভাইস থেকে সাইন-আউট এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা ভালো।
স্বদেশ প্রতিদিন/আরএম