
প্রতিবছর নভেম্বরের ১৪ তারিখে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পালিত হয় বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এই দিনটি ডায়াবেটিস রোগের ঝুঁকি, প্রভাব এবং প্রতিকার সম্পর্কে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে দেশে অনুমিত ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৩৯ লাখ, যা সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এই রোগীদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে সাতজনই কর্মক্ষম অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের কাজে ব্যস্ত। এর ফলে ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত জীবনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডায়াবেটিসের হার বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়াচ্ছে।
ডায়াবেটিস হল এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ যা শরীরের রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থতা সৃষ্টি করে। নিয়মিত পরিমাপ না করলে এবং যথাযথ চিকিৎসা না নিলে এটি চোখ, কিডনি, হার্ট এবং স্নায়ু ক্ষতির মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি, মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি চারজন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে তিনজনই উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অন্যান্য মানসিক সমস্যায় ভুগছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করান, ডায়াবেটিস শুধুমাত্র শারীরিক রোগ নয়; এটি সামাজিক ও মানসিক জীবনেরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় রোগীরা চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগে দীর্ঘ সময় রোগ নিয়ে চুপচাপ থাকে। এর ফলে রোগ নির্ণয় ৪৩.৫% মানুষের ক্ষেত্রে হয়নি, যা স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব ও প্রাথমিক পরীক্ষা না করার ফলাফল।
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোর জন্য বিশেষজ্ঞরা জীবনধারায় পরিবর্তন আনাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং রক্তের শর্করার নিয়মিত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মধুমেহ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে রোগের প্রভাব কমানো সম্ভব।
ডায়াবেটিস রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা বলছেন, রোগীদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য না থাকলে রোগী প্রয়োজনীয় জীবনধারার পরিবর্তন আনতে অনীহা প্রকাশ করে, যা রোগের নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে। তাই চিকিৎসার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সমর্থন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ডায়াবেটিস শুধু বড়দের রোগ নয়; বর্তমান সমাজে যুবক ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এর হার ক্রমশ বাড়ছে। আধুনিক জীবনযাত্রার চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক অনুশীলনের অভাব প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্যবিভাগের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং অরাজনৈতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত কর্মসূচি পালন করছে।
ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একাধিক সেবা প্রদান করছে। যেমন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মেডিকেল ক্যাম্প, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং মানসিক সমর্থন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই উদ্যোগগুলো সম্প্রসারিত হয় এবং সকল জনগণ সচেতন হয়, তাহলে অজানা রোগীর সংখ্যা কমানো সম্ভব।
ডায়াবেটিস রোধের ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করা, নিয়মিত শারীরিক অনুশীলনের উৎসাহ প্রদান, এবং রোগীকে মানসিক সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে কর্মক্ষম মানুষদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ডায়াবেটিস সম্পর্কিত শিক্ষা অপরিহার্য।
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করে। যেমন, রোড শো, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ক্যাম্প, শিক্ষা সেশন এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচার। এই ধরণের উদ্যোগ রোগীদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সহায়ক।
উপসংহারে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য ডায়াবেটিস একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে এটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রভাবিত করছে, অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্যেও বড় প্রভাব ফেলছে। তাই প্রয়োজন নিয়মিত পরীক্ষা, জীবনধারার পরিবর্তন এবং মানসিক সমর্থন। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা হলে রোগের প্রভাব কমানো সম্ভব।
ডায়াবেটিস নিয়ে সচেতন হওয়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং জীবনধারায় স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনা শুধু ব্যক্তিগত নয়, পুরো সমাজের জন্য প্রয়োজন। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস এই বার্তা প্রেরণ করে—“নিজের স্বাস্থ্যকে মূল্য দিন, ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণ করুন”।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে