বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
সনদের পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন জরুরি: শ্রমমন্ত্রী      ৮ মাসে পেরিয়ে গেলেও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া জায় নেই      বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ       একাদশের শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল আরও ৮ জনের      শরণখোলায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির বিক্ষোভ      রৌমারীতে উপজেলা কাব ক্যাম্পুরীর উদ্বোধন      কপোতাক্ষে মিলল ভ্যানচালক ইখলাসের মরদেহ      টাঙ্গাইল সেতুর প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ      মিছিলের চেষ্টা, ছাত্রলীগের ২০ নেতাকর্মী আটক      এনসিপি নেতাদের গণধোলাই দিতে হবে: এমদাদ চৌধুরী      ৬৮ লাখ টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করেছে বিজিবি      
গজারিয়া উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষার মান বেহাল
গজারিয়া (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫, ৪:০৪ পিএম
গজারিয়া উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষার মান বেহাল

গজারিয়া উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষার মান বেহাল

গজারিয়া উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যথাসময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, অবকাঠামো সমস্যা, শিক্ষকদের অপেশাদার মনোভাব ও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বেহাল দশায় পতিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব সর্বাধিক। শিক্ষার ভিত গড়ে উঠে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে।

অথচ গজারিয়া উপজেলার অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজ করছে এক প্রকার নৈরাজ্যকর অবস্থা।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করলেও সে তুলনায় অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষার মান নিম্নগামী।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অদক্ষতা, পাঠদানে অমনোযোগিতা ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের অবহেলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের সময় নিজ এলাকায় নিয়োগের শর্ত থাকলেও গজারিয়া উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক পরিবার নিয়ে অবস্থান করছেন নিজ এলাকার বাইরে শহর এলাকায়।

অধিকাংশ শিক্ষক স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে আগমন ও প্রস্থান করেন না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম তদারকির দায়িত্বে থাকা শিক্ষা কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অনিয়মের সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষকদের সুরক্ষা দিয়ে থাকেন বলে জানা যায়।

গত মাসাধিককাল সময়ে গজারিয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে সরজমিন ঘুরে ও স্থানীয় অভিভাবকসহ এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্রের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

এ সকল অনিয়ম বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানা যায়নি।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার উপজেলার ৬৫ নং চরকালীপুরা বেরুমোল্লাকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে স্কুলে একজন মাত্র শিক্ষক তারিকুল হাসানকে উপস্থিত পাওয়া গেলেও বিদ্যালয়টিতে ওই একই সময়ে কোনো শিক্ষার্থীর দেখা মেলেনি।

তারিকুল হাসান জানান, ওই বিদ্যালয়ে ৫ জন শিক্ষকের পদ রয়েছে। সম্প্রতি প্রধান শিক্ষক শহিদুল্লাহ মিয়া অবসরজনিত ছুটিতে থাকায় তাদের এখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ৫৫ নং ইমামপুর স্কুল থেকে প্রেষণে আসা মানিক মিয়া।

তারিকুল হাসান স্কুলটিতে রয়েছেন তার স্ত্রী সিমন মল্লিকের বদলি শিক্ষক হিসেবে। তার দেওয়া তথ্য মতে, তিনি ৪৬ নং ষোলআনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক; তার স্ত্রী সিমন মল্লিক ৬৫ নং চরকালীপুরা বেরুমোল্লাকান্দী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন।

কিন্তু গত প্রায় এক বছরের অধিক সময় যাবৎ বিশেষ মানবিক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো লিখিত নির্দেশনা ছাড়াই স্ত্রী সিমন মল্লিক স্বামী তারিকুল হাসানের কর্মস্থলে এবং অপরদিকে স্বামী তারিকুল হাসান তার স্ত্রী সিমন মল্লিকের কর্মস্থলে পাঠদান করে যাচ্ছেন।

এদিকে একই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব থাকা প্রধান শিক্ষকসহ অপর শিক্ষকদের কর্মস্থলে ওই সময়ে পাওয়া না গেলে, মানিক মিয়া ফোনে পরবর্তী সময়ে জানান, সময় মতো নৌকা না পাওয়ায় তিনি ও সহকারী শিক্ষক নাজমুন নাহার ওই দিন সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারেননি। এ বিষয়ে কিছু না লেখার জন্যও মানিক মিয়া প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, মানিক মিয়া তার নিজস্ব কর্মস্থল ৫৫ নং ইমামপুর বিদ্যালয় হতে প্রেষণে আনুপাতিকভাবে দূরবর্তী চরকালীপুরা স্কুলে পোস্টিং নিয়েছেন নিজ দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অনিয়ম করার জন্য। অথচ ওই বিদ্যালয় ভুগছে চরম শিক্ষক সংকটে!

চরকালীপুরা গ্রামের বাসিন্দা সানাউল্লাহ মিয়াসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, ওই স্কুলটিতে দশটার পর ক্লাস শুরু হয় এবং শিক্ষকের কেউ সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে আসে না।

এলাকাবাসীর বক্তব্যের সত্যতাও পাওয়া গেল। ২৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার নিজ কর্মস্থলে সকাল ১০টার পরও পাওয়া না যাওয়া শিক্ষক মানিক মিয়াকে পরদিন বুধবার স্কুলের পাঠদান সময়ে দেখা গেল উপজেলা সদরে ঘোরাফেরা করতে। স্কুল রেখে বাইরে কেন জানতে চাইলে বলেন, জরুরি কাজে আসছেন।

মানিক মিয়া স্বীকার করেন, “তার বিদ্যালয়ে যেতে খেয়া নৌকা না পেলে সঠিক সময়ে যাওয়া যায় না, তাই মাঝে মধ্যে যেতে দেরি হয়।”

উপজেলার ৩ নং হোসেন্দী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। সহকর্মীদের মাধ্যমে জানা গেল, তিনি ওই দিন ছুটিতে রয়েছেন কিন্তু ছুটির কোনো দরখাস্ত দেখাতে পারেননি সহকর্মীরা।

ওই দিন জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, শহিদুল ইসলামের ছুটিতে থাকা বিষয়ে তিনি অবগত নন। শহিদুল ইসলামের কন্যা সুস্মিতা ইসলাম একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ সময়ে তারা দুজন ঢাকা থেকে এসে কর্মস্থলে সঠিক সময়ে উপস্থিত হন না।

শহিদুল ইসলাম তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

৪৮ নং টান বলাকী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল পৌনে দশটায় কোনো শিক্ষককেই উপস্থিত পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়ে আগত শিশুরা এদিক ওদিক দৌড়ঝাঁপ করছে।

সকাল দশটার দিকে নাজমা আক্তার নামের একজন সহকারী শিক্ষক হাজির হন কর্মস্থলে। তারপর সকাল সোয়া এগারোটায় আসেন প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্বে থাকা জোবেদা খানম। আরও পরে সকাল সাড়ে এগারোটায় বিদ্যালয়ে আসেন সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম।

শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ কর্মদিবসেই ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে আসে না। ৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ওই দিন ২ জন ছুটিতে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন জোবেদা খানম।

শিশুদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, ঈদে মিলাদুন্নবী দিবসে তারা স্কুল বন্ধ ছিল এবং স্কুলে কোনো মিলাদ বা অনুষ্ঠান হয়নি ওই দিবসটিতে।
এর সত্যতা মিলে স্কুলের পাশের মসজিদে আগত একাধিক মুসল্লির সাথে কথা বলে। বিদ্যালয়ে বিলম্বে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে শিক্ষকগণ একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান।

এদিকে উপজেলার দশটির অধিক বিদ্যালয়ের ভূমির কিছু অংশ দখলদারদের কবলে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উপজেলার ৪২ নং কাজীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৫ নং বড়ভাটেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬১ নং টেংগারচর প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৩ নং টেংগারচর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১৭ নং ভবেরচর প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের জমির কিছু অংশ দখলদারদের দখলে রয়েছে।

উপজেলার ৫৫ নং ইমামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২০ নং পৈক্ষারপাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়।

গজারিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের আশিটির অধিক পদ শূন্য রয়েছে।

সহকারী শিক্ষক দম্পতি তারিকুল ইসলাম-সিমন মল্লিক, কর্তৃপক্ষের কোনো লিখিত নির্দেশনা ছাড়া বছরের অধিক সময়ে একে অপরের বিদ্যালয়ে পাঠদানের বিষয়ে জানতে চাইলে গত রবিবার ওই ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত গজারিয়া উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসাইন দাবি করেন, অফিস বিষয়টি অবগত। মানবিক কারণে ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। লিখিত কোনো নির্দেশনা নেই বলেও ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেন।

এদিকে ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে এগারোটার দিকে সহকারী শিক্ষক সিমন মল্লিকের বদলি কর্মস্থল ৪৬ নং ষোলআনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল সিমন মল্লিক প্রতিষ্ঠানটির উত্তর পাশের ভবনের দ্বিতীয় তলার প্রথম শ্রেণির পাঠদানের সময়ে ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। অচেনা আগন্তুক দেখে চট করে ক্লাসে ঢুকলেন।

গজারিয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহানাজ পারভিন আজ মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) মোবাইল ফোনে জানান, তিনি সময় নিয়ে পরিদর্শন করে সার্বিক বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।


স্বদেশ প্রতিদিন/এমএএম



আরও সংবাদ   বিষয়:  গজারিয়া   






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close