যেখানে আগে ব্যাটারিচালিত রিকশাকেন্দ্রীক সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল, সেখানে গত পাঁচ মাস ধরে নিকুঞ্জে একটিও দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। হ্যাঁ! বলছি রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার কথা। যা এখন ঢাকাসহ সারা দেশের জন্য অনুপ্রেরণার মতো।
আজ সোমবার ( ৬ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় নিকুঞ্জ টানপাড়া, জামতলা, সরকার বাড়ি ও পুরাতন বাজার ব্যাটারিচালিত রিকশামুক্ত, শান্ত ও শৃঙ্খল পরিবেশ।
পথচারীরা বলছেন, “একসময়কার উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, হুমকি আর মৃত্যুর ভয়ে জবুথবু থাকা রাস্তায় এখন তারা নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন। শিশু-কিশোররাও আনন্দের সঙ্গে সাইকেল চালাচ্ছে, দৌড়াচ্ছে।”
গুলশান, বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় প্রশাসনের নানা স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও অবৈধ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা যখন অসম্ভব, তখন নিকুঞ্জবাসী তাদের ইস্পাত-কঠিন ঐক্য আর সীমাহীন সাহসের জোরে সড়কের এই ‘অভিশাপ’ থেকে মুক্ত হয়েছেন। চলতি বছর ৩০ এপ্রিল থেকে নিকুঞ্জ টানপাড়ার সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ও সক্রিয় ভূমিকায় এ পরিবর্তন আসে। গত ছয় মাসে এই এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢুকতে পারেনি।
জানা যায়, অনিরাপদ, অবৈধ ও নানা ভেজাল সৃষ্টিকারী ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো যখন অব্যাহতভাবে একের পর এক দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছিল, তখন ত্যক্ত-বিরক্ত-অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন নিকুঞ্জবাসী। তাদের ক্ষোভ আর জেদ জন্ম দেয় ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে এক গণ-আন্দোলনের। এসব ত্রিচক্র যানগুলো বিরুদ্ধে তারা মিছিল, মিটিং, সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন।
এই বিষয়ে স্থানীয় একজন বলেন, “ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের মাধ্যমে আমাদের পুরো এলাকা অভিশাপ মুক্ত হয়েছে। আমার ছোট ভাইকে এই রিকশার কারণে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গু হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। এখন এই অবৈধ যান বন্ধ হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্ত জারি থাকবে। কোনোভাবেই আর নিকুঞ্জের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে দেওয়া হবে না।”
প্যাডেল রিকশাচালক সেলিম বলেন, ব্যাটারি রিকশার কারণে আমাদের প্রায় না খেয়ে
মরার অবস্থা হয়েছিল। তারা যাত্রী ছিনিয়ে নিত, আমরা কেউ যাত্রী পেতাম না।
অদক্ষ ও কমবয়সী চালকরা উচ্ছৃঙ্খলভাবে অটোরিকশা চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতেন, আর
দোষ পড়ত রিকশাচালকদের ঘাড়ে। এখন অটোরিকশা বন্ধ হওয়ায় মানুষ নিরাপদে চলাচল
করতে পারছে, আর আমাদের রোজগারও বেড়েছে।
নিকুঞ্জ মডেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, “নিকুঞ্জ এলাকায় প্রতিদিনই অটোরিকশার কারণে দুর্ঘটনা ঘটত। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও সোসাইটির সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগে তা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এসব অটোরিকশার কারণে বহু বৃদ্ধ, পথচারী ও শিক্ষার্থী দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। এখন সবাই নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছেন। আমাদের কলেজ থেকেও খিলক্ষেত মডেল থানায় একটি আবেদন দেওয়া হয়েছে, যাতে পুনরায় অটোরিকশা চালু না হয়।”
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজ্জাত হোসেন বলেন, “অটোরিকশা বন্ধে নিকুঞ্জ এলাকাবাসীর এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। যদিও কিছু ব্যক্তি পুনরায় অটোরিকশা চালুর দাবি তুলেছেন, তবুও এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে থানায় একাধিক অবহিতকরণ আবেদন জমা দিয়েছেন। তাদের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা তাদের পাশে রয়েছি।”
তিনি আরো বলেন, “এখন এই এলাকায় দুর্ঘটনা প্রায় নেই বললেই চলে। এলাকাবাসীরাই এই এলাকার প্রকৃত মালিক ও অধিবাসী। তারা যতদিন এই সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে চান, ততদিন তা বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।”
এই বিষয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন তারা আর এই এলাকায় অটোরিকশা দেখতে চাননা।