
সংগৃহীত ছবি
শুরুটা হয় ‘মাহবুব ক্রিয়েশন ফোর’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে। প্রথম ছিন্নমূল মানুষদের চুল ও জটা কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুধু ছিন্নমূল নয়, ফকির-সন্ন্যাসী কেউই এর বাইরে থাকতেন না।
তবে উদ্দেশ্য শুধু মানব সেবাই নয় মানব সেবাকে হাতিয়ার করে ফেসবুক থেকে রাজস্ব আয়। কারন এই সব ভিডিও আপলোড করা হতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। শুধুতাই নয় পাশাপাশি নেওয়া হতো প্রবাসীদের কাছ থেকেও অনুদান।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, একজন মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার নামে যে ব্যয় হয়, ভিডিও থেকে তার বহুগুণ আয় করা সম্ভব হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় দেশি ও প্রবাসীদের অনুদান। চুল ও জটা কেটে দেওয়ার আড়ালে গড়ে ওঠে বড় এক বাণিজ্য। অথচ যারা অর্থ সহায়তা দেন, তারা এই নেপথ্যের হিসাব জানেন না। মাঝেমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হতো ‘মাহবুব ক্রিয়েশন ফোরে’র এসব কাজ।
সম্প্রতি এমন একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়ে আলোচনায় আসে- যেখানে এক ব্যক্তির জোর করে জটা কেটে দেওয়া হয় ওই ঘটনায় ধস্তাধস্তি ও মারামারিও হয়। এসময় লিটন সাধু প্রাণপণ চেষ্টা করেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। তিনি লাথিও মেরেছিলেন, কিন্তু সব ব্যর্থ হয়। চুল কেটে দেওয়ার পর তার হাতের প্রায় ৫০ ভরি রুপার বালা লুটে নেওয়া হয়, যার মূল্য আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা।
জানা যায়, লিটন সাধুকে যেভাবে ধরে চুল ও জটা কেটে দেওয়া হয়েছে, একইভাবে আরো অনেককেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার নামে এভাবে চুল ও জটা কেটে দেওয়া হয়েছে। মাহবুবের এমন কর্মকাণ্ডের খবর প্রথম প্রকাশিত হয় গত ১৪ আগস্ট।
তবে সম্প্রতি তার ফেসবুক লাইভের বক্তব্য থেকেও সেটি স্পষ্ট হয় যে, মাহবুবই দেশে এ ধরনের চুল ও জটা কাটার প্রবণতা প্রথম শুরু করেন।
উল্লেখ্য, ওই ব্যক্তির নাম লিটন সাধু। তিনি রাজধানীর পোস্তগোলা মহাশ্মশানে
লাশ সৎকারের কাজ করেন এবং পাশাপাশি সদরঘাট এলাকায় ফল বিক্রি করেন।
আধ্যাত্মিক ভাবনা থেকে তিনি দীর্ঘদিন চুল-দাড়ি লম্বা রেখেছিলেন। দুই হাতে
ছিল ধাতব বালা।
মাহবুব এবং (মাহবুব ক্রিয়েশন ফোর)’র বিস্তারিতঃনিজের নামে একটি ওয়েবসাইট খুলেছেন মাহবুবুর রহমান। সেখানে ‘জীবনবৃত্তান্ত’ আকারে নিজের পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
নিজেকে সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর দাবি করে তিনি লিখেছেন, “তার নাম মাহবুবুর রহমান, ডাক নাম মাহবুব সরকার। বাবার নাম সামছুল আলম। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও গ্রামে। স্থানীয় পঞ্চগ্রাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাস করে ২০২০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার জন্য ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজে ভর্তি হন তিনি।”
২০২১ সালে আমার ভেতরে এই মানুষগুলোকে নিয়ে ভাবনা শুরু হয় উল্লেখ করে ওয়েবসাইটে মাহবুব লিখেছেন, “ঢাকা আসার পর থেকে রাস্তার এই মানুষগুলোকে দেখে ভিতরে একটা মায়া কাজ করত। তাদের কাছাকাছি যেতাম। তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম। তাদের জন্য কিছু একটা করার আগ্রহ বাড়তে থাকে।” তার দলের সদস্য হিসেবে তিনি মাহফুজ, সৌরভ দাশ ও প্রিতম শর্মার নাম উল্লেখ করেছেন।”
সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে মাহবুব বলেন, “ইদানীং আমাদের কাজগুলোকে অনেকেই সমালোচনা করতেছে, ট্রল করতেছে। আমরা অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমরা হয়তো এই কাজটা আর বেশি দিন করতে পারব না, আমরা হতাশ হয়ে যাচ্ছি। এতো বাজেভাবে আমাদের কাজ উপস্থাপন করছে যা বলার বাইরে।”
এদিকে মাহবুবের কাজ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। তাকে অনুসরণ করে অনেকে উৎসাহী হয়ে ওঠে, কারণ এই কাজে খরচ কম অথচ ফেসবুক–ইউটিউবের রাজস্ব ও অনুদানের সুযোগ বেশি। মাহবুব নিজেই অনেকের চুল জোরপূর্বক কেটে দিয়েছেন, যার ভিডিও তার ইউটিউব ও ফেসবুক পেজে রয়েছে।
নিজের কাজ শুরুর গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি যখন ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় আসি, তখন এদের এই অবস্থা দেখে আমার খুবই খারাপ লাগে, তখন এসব কাজ শুরু করি। তবে খাওয়ার দাওয়ার দেওয়া, পরিচ্ছন্ন করার এই কাজ আমরা শুরু করি দুই বছর হয়ে গেছে। এই দুই বছরে আমরা কোনো প্রশ্নের মুখে পড়িনি।”
এইসব টিমগুলোর কারণে আমি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি উল্লেখ করে এই তরুণ বলেন, “আমার একটাই টিম, আমার কোনো জেলাতে টিম নাই। আমরা যখন কাজ করি মানুষগুলোর সঙ্গে খুবই নমনীয় ব্যবহার ও ভালোবাসা দেখিয়ে কাজ শুরু করি। কখনো তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হয় না কিংবা আঘাত দেওয়া হয় না। ইদানীং দেখছি অনেকেই এসব কাজ করতেছে যারা বলছে এসব আমাদের টিম বা আমাদের হয়ে কাজ করতেছে।”
তবে বাস্তবে মাহবুব দীর্ঘদিন মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এসব কাজ চালিয়ে গিয়েছেন তিনি।
এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “এরা চুল কেটে দিচ্ছে তাদের একটা নিজস্ব বিশ্বাসের জায়গা থেকে, যেটা তাদের এখতিয়ার নাই। ওই ব্যক্তির কোনো দায়িত্ব নেবেন না, পুনর্বাসন করবেন না। যদি ধরে নেই, ব্যক্তিটার চালচলনের জায়গা থেকে তাকে পুনর্বাসন করবেন, তাহলে সেটারও না হয় একটা অর্থ দাঁড়ায়। কিন্তু কেবল সাধক, ফকির বা সন্ন্যাসীদের চুল কেটে দেওয়া আদর্শিক জায়গা থেকে কারও এখতিয়ার নাই। সংবিধান কাউকেই হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার কাউকে দেয় নাই।”
এ ধরনের কাজকে ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমি চুল লম্বা রাখব না ছোট রাখব, না আদৌ রাখব না, সেটা তো আমার সিদ্ধান্ত। এখানে রাষ্ট্রেরও হাত দেওয়ার সুযোগ নাই।”
মাহবুব আরো লেখেন, “আমাদের কোনো কাজের মাধ্যমে কেউ যদি কোনো কষ্ট পেয়ে থাকেন। ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।”
ক্ষমা চেয়ে আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, “যদি আমাদের কাজটা অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। হয়তো আমার চোখে যেটা ভালো সেটা আপনাদের চোখে খারাপও হতে পারে। তাই যদি ভুল করে থাকি। ছোট মানুষ হিসেবে ক্ষমা করে দেবেন। আজ থেকে আমাদের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে সবাই ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।”
তবে তার এই কর্মকাণ্ডে বেশ সরব হয়ে উঠে নেটিজেনরা। তারা তার এই ভিডিওর পক্ষে এবং বিপক্ষে নানা পোস্ট এবং মন্তব্য করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে লক্ষ্যনীয় যে বেশিরভাগ নেটিজেনই তার এই কার্যক্রমকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পানেনি।