ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতিকে প্রভাবিত করবে না: মাইকেল কুগেলম্যান

ছবিটি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হলে থেকে তোলা
আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং দক্ষিণ এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ভবিষ্যতে আমরা এমন এক সময়ের দিকে যাত্রা করছি, যেখানে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতিকে আর প্রভাবিত করবে না।
রবিবার (৭ সেপ্টম্বর) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের আয়োজনে 'Navigating New Currents: Bangladesh-US Relations in the Indo-Pacific Century' বিশেষ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (CPS) আয়োজিত 'Eminent Persons Lecture Series' টি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হলে অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী এবং সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন সেন্টার অব পিচের পরিচালক অধ্যাপক মো. জসিম উদ্দিন।
অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাইকেল কুগেলম্যান। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক কুগেলম্যান বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
কুগেলম্যান বলেন, যে কোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যদি তৃতীয় রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়, তবে তা ভালো সুসম্পর্কের জন্য অনুকূল নয়। বাস্তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সর্বাধিক শক্তিশালী হয় তখনই, যখন তা সংশ্লিষ্ট দুই রাষ্ট্রের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত হয়, তৃতীয় রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পরিচালিত হয়েছে। তবে, ভবিষ্যতে আমরা এমন এক সময়ের দিকে যাত্রা করছি, যেখানে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতিকে আর প্রভাবিত করবে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক তার মতামত জানতে চাইলে তিনি জানান, “এটি বলা কিছুটা কঠিন। প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দীর্ঘকাল ধরে এবং এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও, বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত যুগে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক ওয়াশিংটনে তেমন কোনো কৌশলগত অগ্রাধিকার পায়নি। বাংলাদেশকে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা আমার মতে একটি গুরুতর ভুল ছিল, কারণ বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে, প্রকৃতপক্ষে কোনো নির্দিষ্ট কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিই গড়ে ওঠেনি। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক সামনের দিকে যাত্রা শুরু করলে, বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিস্তর আলোচনা পরিলক্ষিত হয়। বাণিজ্য সবসময়ই একটি স্থায়ী উপাদান। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন সামনে অগ্রসর হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়, তখন একে কিছুটা দ্বিপাক্ষিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা হয়, বিশেষত বাণিজ্যিক সুযোগ ও সম্ভাবনার কারণে। তবে ইন্দো-প্যাসিফিক যুগে প্রবেশের পর প্রেক্ষাপট কিছুটা পরিবর্তিত হয়। কারণ তখন চীনের বিষয়টি সামনে আসে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল কার্যকর হওয়ার পর থেকে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সম্পর্ক চীনের প্রেক্ষাপটে বিবেচিত হয়েছে। অবশ্য বাইডেন প্রশাসনের সময়ে মানবাধিকার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মতো বিষয়গুলোর ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল, সেটি ছিল সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি। এটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করায় শেখ হাসিনা সরকারের জন্য তা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো এবং এতে বাংলাদেশের চীনের দিকে আরও ঝুঁকে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থবিরোধী। তথাপি, বিষয়টি তখন কেবল দ্বিপাক্ষিক কাঠামোয়ই সীমাবদ্ধ ছিল।
তিনি আরো বলেন, তবে এ বিষয়ে আরেকটি প্রসঙ্গ হলো, মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি বার্তা প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তিনি দাবি করেন যে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় আক্রান্ত হচ্ছে। আমার ধারণা, এটি ছিল নিছক নির্বাচনী বা ভোটের রাজনীতি। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী লবিস্ট গোষ্ঠী তাঁকে এ ধরণের বক্তব্য প্রদানে উৎসাহিত করেছিল, এবং তিনি সেটি করেছেন।”
তিনি যোগ করেন, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আমার ধারণা যুক্তরাষ্ট্র এখনো ভারতের ইচ্ছার প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল থাকবে, এমনকি বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণেও নয়। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মনোযোগ বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল, ফলে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে কিছুটা গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা ছিলো। তবে ভারত শেখ হাসিনার ওপর মানবাধিকার ও নির্বাচনী ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ চায়নি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করেছে।"
তবে এখানে অন্যান্য উপাদানও কার্যকর ছিল। অদূর ভবিষ্যতে আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করছি, যেখানে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতিকে তেমন প্রভাবিত করবে না। তবে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ভারতের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টির প্রকৃতি কীভাবে রূপ নেয়, সেটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। জানা গেছে যে তিনি নয়া দিল্লি থেকে এশিয়া বিষয়ক নীতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, তাহলে ওয়াশিংটনে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা কী হবে? যদি ভারতে অবস্থানরত ওই কর্মকর্তা দক্ষিণ এশিয়া নীতি নির্ধারণে যথেষ্ট প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন, তবে বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বদেশ প্রতিদিন/শাহো