
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবার চরম অব্যবস্থাপনা ও জনবল সংকটের কারণে সরকারি হাসপাতাল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলঘেরা ১ পৌরসভা ও ১৪ ইউনিয়নের ৫ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভরসা করছে প্রাইভেট ক্লিনিকের ওপর।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তিন বছর আগে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। নতুন ভবন থাকলেও গাইনি সার্জন, এনেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ও এক্স-রে টেকনিশিয়ানসহ ১৫৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। জরুরি অপারেশন বিশেষত প্রসূতি মায়েদের জন্য সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। গত ১৬ বছরে ১৪ বছরই হাসপাতালে গাইনি ও এনেস্থেসিয়া চিকিৎসক ছিলেন না।
হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে মেশিন ১৩ বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অপারেটর না থাকায় একসময় বাক্সবন্দী ছিল যন্ত্রটি, বর্তমানে ঘন ঘন নষ্ট হয়। চিকিৎসকদের মতে, এতে রোগ নির্ণয় মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এছাড়া হাসপাতাল ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ওষুধের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাজার থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে দায়িত্বে গাফিলতি করছেন। আউটডোর সকাল সাড়ে আটটায় শুরু হলেও অনেকে আসেন ১০টার পর এবং দুপুরে দ্রুত প্রাইভেট চেম্বারে চলে যান। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও দেখা যায়, জরুরি বিভাগে পুলিশ কেস এন্ট্রির জন্য রোগীর কাছে ৫০০ টাকা দাবি করা হচ্ছে।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এই দুরবস্থার সুযোগ নিচ্ছে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো। ফলে গরিব মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জোরখালী গ্রামের নাছির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি হাসপাতালে গেলাম স্ত্রীর প্রসব করাতে, কিন্তু অপারেশন হয় না। এখন প্রাইভেটে যেতে হবে। টাকা নেই, দেনা করে জীবন চালাই, অথচ গরিবের হাসপাতাল গরিবকে নেয় না।”
কলাকান্দা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মেহেদী হাসান জানান, “ডাক্তার থাকলে গরিব মায়েরা নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে পারত। আমার এলাকার এক দরিদ্র মা সিজারের বিল পরিশোধ করতে সন্তান বিক্রি করেছে—এটা কতটা করুণ ভাবুন!”
এ বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. মেহেদী হাসান নাহিদ বলেন, “জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। তবু আমরা সীমিত সামর্থ্যে যতটুকু সম্ভব কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে এখনো জনবল নিয়োগ হয়নি, ফলে প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর