
বাংলাদেশের বিস্কুট বাজারে এখন এক নতুন সময় চলছে। একসময় বিদেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের দাপটে দেশীয় বিস্কুট ছিল গৌণ, কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে। বেলামের ‘ক্রিমো’ ওরিওর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে, তাদের ‘চকলেট ফন্ডু’ ভারতের জনপ্রিয় ‘ডার্ক ফ্যান্টাসি’র সমকক্ষ। ইফাদের ‘বিস্কফ’ চেষ্টা করছে বেলজিয়ামের বিখ্যাত ‘লোটাস বিস্কফ’-এর স্বাদ ধরতে।
২০২০ সালের শরতের এক বিকেলে গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে কেনাকাটা করতে গিয়ে নুসরাত বিস্মিত হলেন—প্রিয় ওরিও বা ডিউবেরি বিস্কুটের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ থেকে ১৫০ টাকা। গত পাঁচ বছরে বিদেশি বিস্কুটের দাম গড়ে ১০০ টাকা বা তার বেশি বেড়ে গেছে। একসময় যা ছিল সহজলভ্য ছোট্ট আনন্দ, এখন তা অনেকের জন্য বিলাসপণ্য হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিন দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো ছিল স্বল্প বৈচিত্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ—নাবিস্কো, অলিম্পিক, হক বা প্রাণের বিস্কুট ছিল সাধারণত পাতলা, মচমচে ধরনের। পশ্চিমা বাজারে নানা শৈলীর কুকি ও বিস্কুট জনপ্রিয় হলেও, বাংলাদেশ তখনো রেসিপি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে ছিল।
সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে। ২০১৪ সালে অলিম্পিকের ‘নাটি বিস্কুট’ অফিসপাড়ার তরুণ কর্মীদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়, প্রমাণ করে—ডাইজেস্টিভ বা এনার্জি বিস্কুটের বাইরে নতুন স্বাদের চাহিদা আছে।
নর্থ এন্ড কফি রোস্টার্স ঢাকায় কুকির জনপ্রিয়তা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে—‘আমেরিকান স্টাইল’ নরম ভেতর ও মচমচে বাইরের কুকি অনেককে প্রথমবারের মতো কুকির আসল স্বাদের অভিজ্ঞতা দেয়। এরপর ‘ইনডালজ’ ও ‘টেস্টি ট্রিট’-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো কাজুবাদাম, মাখন, বা বাদামজাত কুকির বাজার তৈরি করে।
বর্তমানে দেশীয় বিস্কুট শুধু সস্তা বিকল্প নয়, বরং মান ও স্বাদে বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী। কোকোলার ‘দ্য রিয়েল চকলেট রোল’ বিদেশি ওয়েফারের তুলনায় সাশ্রয়ী দাম ও ভালো স্বাদে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র ব্র্যান্ড এক্সিকিউটিভ মো. শওকত মাহমুদ জানান, আগে তারা ৫ থেকে ১৫ টাকার প্যাকেটের উপর জোর দিতেন, কিন্তু পরে বুঝেছেন—পরিবারের জন্য উপযোগী ও বারবার কেনা যায়—এমন পণ্যই দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য আনে। তাই ৪০-৫০ টাকার বড় প্যাক ও ১৫০ টাকার প্রিমিয়াম ‘সুইট ফ্যান্টাসি’-এর মতো পণ্য চালু করেছেন।
তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্ম নতুন স্বাদে আগ্রহী এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুখে-মুখে প্রচার ব্র্যান্ডের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে অলিম্পিকের ১১টি উৎপাদন লাইন থেকে শুধু বিস্কুট বিক্রিতেই প্রতি মাসে আয় হচ্ছে ২৫০–২৮০ কোটি টাকা।
দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো বিদেশি স্বাদের ছাপ রেখে স্থানীয় রুচির সঙ্গে মিলিয়ে পণ্য তৈরি করছে। যেমন—নিউজিল্যান্ড ডেইরির ‘ক্রাশ বিস্কুট’ লেমন ফ্লেভারে জাপানি অনুপ্রেরণা নিলেও, গবেষণার মাধ্যমে তা বাংলাদেশি ভোক্তার পছন্দের মতো করে তৈরি হয়েছে।
তবে এই অনুকরণ নিয়ে সমালোচনাও আছে। গ্রে অ্যাডভারটাইজিং বাংলাদেশের অ্যাকাউন্ট ডিরেক্টর এম রাশিদুল আরেফিন মনে করেন, বিদেশি ব্র্যান্ড হুবহু নকল করা মৌলিক চিন্তার অভাব নির্দেশ করে। বরং সঠিক ব্র্যান্ডিং, উন্নত প্যাকেজিং ও স্থানীয় স্বাদ বোঝাই সাফল্যের চাবিকাঠি।
গত পাঁচ থেকে আট বছরে দেশীয় কোম্পানিগুলো প্যাকেজিংকে ভোক্তার প্রথম ছাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। চকচকে মোড়ক ও আধুনিক নকশা এখন আর শুধু বিদেশি ব্র্যান্ডের একচেটিয়া নয়। গোল্ডমার্ক এ ক্ষেত্রে পথিকৃত, আর অলিম্পিকও আন্তর্জাতিক মানে প্যাকেজিংয়ে এগিয়ে গেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বিদেশি পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে—হাইড অ্যান্ড সিক, জুলিজ, মাঞ্চিজ বা ডার্ক ফ্যান্টাসির মতো ব্র্যান্ড এখন আগের তুলনায় অনেক কম ক্রেতা পাচ্ছে। ফলে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো কেবল বিকল্প নয়, অনেকের কাছে প্রথম পছন্দ হয়ে উঠছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ