
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রেমের প্রলোভনে ফাঁদ পেতে প্রতারণা চালাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। চক্রটি মূলত সুন্দরী তরুণীদের ব্যবহার করে সমাজের প্রতিষ্ঠিত, ধনাঢ্য ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করছে। শুধু দেশি নাগরিকই নয়, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের বিরুদ্ধেও এ চক্রের কার্যক্রম রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।
হানি ট্র্যাপ নামের এ প্রতারণা পদ্ধতিতে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে তরুণীরা। একপর্যায়ে অনলাইন ভিডিও কলে খোলামেলা আলাপচারিতার সময় ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। কখনও কখনও বাসায় ডেকে এনে সরাসরি জিম্মি করেও আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ফেসবুক, ইমো, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের শর্ট ভিডিও ব্যবহার করে এসব তরুণীরা টার্গেট বাছাই করে। বিশেষ করে ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার জানায়, মাসে গড়ে অন্তত ৩০টি গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায় হানি ট্র্যাপ সংক্রান্ত। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ভুক্তভোগী সামাজিক মর্যাদার ভয়েই আইনি ব্যবস্থা নিতে চান না।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানায়, চক্রের অনেক সদস্য দেশের বাইরে অবস্থান করে। ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে আদায় করা টাকা হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাঠানো হয় বিদেশে। চক্রের সদস্যরা বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট খুলতে ভুয়া নাম-ঠিকানা ও সিমকার্ড ব্যবহার করে, ফলে অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সৌদি প্রবাসী জানান, ইমোতে এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয় থেকে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ভিডিও কলে খোলামেলা কথাবার্তার সময় দৃশ্য ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। তার দাবি, প্রতারকচক্রের হাতে চার লাখ টাকা দিয়েছেন।
বরিশালের এক ভুক্তভোগী ফেসবুক পেজ ‘লাভারস ওয়ার্ল্ড’-এর মাধ্যমে এক নারীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ শুরু করেন। একপর্যায়ে এনআইডি ও ছবি দিয়ে যৌথ ব্যবসার প্রস্তাবে সম্মত হন। পরে তার নামে নগ্ন ছবি তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করা হয়।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ফেসবুকে নেপালি এক তরুণীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থেকে ভিডিও কলে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে তার মাকে চিকিৎসা করানোর অজুহাতে প্রথমে ৫০ হাজার এবং পরে আরও টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ছবি ভাইরাল করার হুমকি দেয় ওই তরুণী।
হুমকির মুখে সরকারি কর্মকর্তারাও
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, এ চক্রের প্রধান টার্গেট হচ্ছেন বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী এবং প্রবাসীরা। ফোন নম্বর রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ভুয়া তথ্য ব্যবহারের ফলে অভিযুক্তদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার বলেন, “শুধু আইন প্রয়োগ করে এ ধরনের সাইবার অপরাধ থামানো যাবে না। এ জন্য নাগরিকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হওয়া জরুরি।”
তিনি আরও জানান, বেশিরভাগ ভুক্তভোগী প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় সহজেই এ ধরনের ফাঁদে পড়ছেন। সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে অনেকেই চুপ থাকেন, ফলে অপরাধীরা উৎসাহ পায়।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, হানি ট্র্যাপ একটি অত্যন্ত চতুর সাইবার অপরাধের কৌশল। মূলত ধনাঢ্য, প্রভাবশালী ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের টার্গেট করেই এই ফাঁদ পাতা হয়। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ডিজিটাল ব্যবহার বাড়লেও সাইবার সচেতনতা বাড়েনি। ফলে প্রতারণার এই ধরন দিনে দিনে ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।
সূত্র: যুগান্তর
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর