
প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেছেন, অতীতে দেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যা কিছুই ঘটুক না কেন, এখন থেকে এটি হবে একটি প্রো-বাংলাদেশ নীতি, যা দেশের স্বার্থে পরিচালিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ বক্তব্যকে কাজে রূপ দিতে ২৪ ঘণ্টারও কম সময় নিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচের সফরকালে তাকে দুই দেশের মধ্যকার অমিমাংসিত বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় এবং একইসাথে পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করার কথাও বলা হয়।
আজ, ১৮ এপ্রিল (শুক্রবার) সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোষ্টে তিনি এমন কথা বলেন।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, বাংলাদেশ কি এখন পাকিস্তানপন্থি পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঝুঁকছে? এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলাম প্রশ্নটি মোটেই আমাদের অবাক করেনি। সব সময়ই কিছু মানুষ থাকবে যারা বাংলাদেশের স্বাধীন পরিচয়ে বিশ্বাস করতে চায় না।
তিনি আরও লেখেন, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ককে ব্যাহতকারী সবচেয়ে আবেগপ্রবণ বিষয়গুলোর একটি হলো—১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা ও নৃশংসতার জন্য পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি। পাকিস্তানের অনেক নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের মতে ক্ষমা প্রকাশ সদিচ্ছা ও সৌজন্যের একটি প্রতীক হতে পারত, কিন্তু সে দেশের পররাষ্ট্র দফতর ও সামরিক আমলাতন্ত্র বরাবরই এমন একটি ভাবনার বিরোধিতা করেছে যার ফলে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি কখনোই আলোর মুখ দেখেনি।
সম্পদ বন্টনের বিষয়টি উল্লেখ করে উপ প্রেস সচিব আরও লেখেন, অতীত সরকারগুলো আলোচনার চেয়ে বিচ্ছিন্নতায় বেশি গুরুত্ব দেয়ায় সম্পদ বণ্টনের বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত ছিল। অভ্যন্তরীণ মূলধন সৃষ্টি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বৈদেশিক আর্থিক সম্পদের অধিকার রক্ষার ভিত্তিতে তৈরি করা এক হিসাবে দেখা যায় ১৯৭৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশের পাকিস্তানের কাছে কমপক্ষে ৪.৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের দাবি রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ আরও প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দাবি করে, যা ১৯৭০ সালের নভেম্বরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সাইক্লোন দুর্গতদের জন্য বিদেশি দেশ/সংস্থাগুলোর দেওয়া অনুদান ছিল। এই অর্থ পাকিস্তান স্টেট ব্যাংক ঢাকা শাখায় জমা ছিল, যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্থানান্তরিত হয়ে যায় পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের লাহোর শাখায়।
অবশিষ্ট পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন ইস্যুটিও দুই দেশের সম্পর্ককে ব্যাহত করেছে। অতীতে পাকিস্তান কেবল মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষকে ফেরত নিয়েছে, অথচ এখনও প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার মানুষ বাংলাদেশের ১৪টি জেলার ৭৯টি ক্যাম্পে বসবাস করছে।
এইসব বিষয়গুলোই মূলত দুই দেশের পারস্পারিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে।
এই সমস্যাগুলোর সমাধানের সর্বোত্তম পথ অবশ্যই আলোচনা, এবং ঠিক এটিই করার চেষ্টা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। অনেক বছর পর পাকিস্তানকে আলোচনায় এনেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং যথাযথভাবে বিষয়গুলো উত্থাপন করেছে।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, মিশরে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে, এসব অমিমাংসিত বিষয়ের সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এবং বৃহস্পতিবার রাষ্টীয় অতিথি ভবন যমুনায় বালুচের সঙ্গে বৈঠকে তিনি একই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। একই বৈঠকে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ার ব্যাপারে গুরুত্বরোপ করেন যাতে এই অঞ্চলের বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়।
পূর্বের শত্রুতা কিভাবে পরবর্তীতে মিত্রতা হয়ে উঠেছে তার উদাহরন টেনে উপ প্রেস সচিব লেখেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একত্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে বোমা ফেলেছিল, কিন্তু পরে জাপানকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে।
সম্ভবত এখন সময় এসেছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেরও অতীতের বিষয়গুলো সমাধান করে ভবিষ্যতের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার। এক প্রতিবেশীকে খুশি রাখতে আরেক প্রতিবেশীর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করা একটি স্বাধীন জাতির পররাষ্ট্রনীতি হতে পারে না।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ