
আজকাল একটি দৃশ্য খুবই পরিচিত-মায়ের হাতে খাবারের বাটি আর শিশুর হাতে মোবাইল। কার্টুনে মগ্ন শিশুটি খাবার চিবানোর বদলে স্ক্রিনে চোখ রাখে, আর মা বাচ্চাকে খাওয়ানোর সাফল্যে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। কিন্তু আমরা কি একবারও ভাবছি, এই সহজ পথটি শিশুদের জন্য কতটা ক্ষতিকর?
শিশুকে মোবাইল স্ক্রিনে ব্যস্ত রেখে খাওয়ানো মানে তাদের খাবারের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। শিশুদের মধ্যে খাবার গ্রহণের প্রতি যে আগ্রহ থাকা উচিত, তা বদলে যাচ্ছে স্ক্রিন-নির্ভরতায়। মা-বাবারা হয়তো ভাবছেন, এভাবে খাওয়ালে কাজটা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু এটি একটি অদৃশ্য ফাঁদ, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
প্রথমত, খাবারের সময় মোবাইল স্ক্রিনে মনোযোগ দেওয়ার কারণে শিশুদের মস্তিষ্ক একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে আটকে যায়। খাবার ও স্ক্রিন একসঙ্গে অভ্যাস হয়ে গেলে, স্ক্রিন ছাড়া তারা আর খাবার খেতে চায় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস বাধাগ্রস্ত হয়।
দ্বিতীয়ত, শিশুরা খাবারের সময় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর যে সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে, তা এই অভ্যাসের ফলে নষ্ট হয়ে যায়। একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মধ্যে পরিবারের বন্ধন যেমন দৃঢ় হয়, তেমনি শিশুরা শেখে শিষ্টাচার এবং পারস্পরিক যোগাযোগের কৌশল। কিন্তু স্ক্রিন-নির্ভরতায় তারা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
তৃতীয়ত, ছোটবেলা থেকেই স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিশুরা বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যায় এবং তাদের কল্পনাশক্তি হ্রাস পায়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সমস্যার সমাধান কী? এটি আসলে আমাদের হাতেই। সন্তানকে প্রযুক্তি নির্ভরতা থেকে দূরে রাখতে হলে প্রথমেই মা-বাবার ধৈর্য বাড়াতে হবে। খাওয়ানোর সময় শিশুর মনোযোগ আকর্ষণ করতে গল্প বলা, গান গাওয়া বা কোনো সৃজনশীল খেলায় যুক্ত করা যেতে পারে। একইসঙ্গে একত্রে খাবার খাওয়ার পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে শিশুদের সামাজিক দক্ষতা শেখানো সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তি ব্যবহারকে সীমিত করতে হবে। শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে, এটি কি তাদের জন্য সত্যিই প্রয়োজনীয়, নাকি আমরা নিজেদের কাজ সহজ করার জন্য তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপস করছি।
শিশুর শৈশব তাদের জীবনের ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে ভবিষ্যৎ টলমল হবে। তাই আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের শৈশব রক্ষা করি। প্রযুক্তির প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা যেন কখনোই আমাদের সন্তানদের শৈশবের বিকল্প না হয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর