
ইউক্রেন যুদ্ধের পরিধি ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় সামরিক ও বেসামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। অবকাঠামোর নিরাপত্তা বাড়ানো, হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা এবং নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বানের মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য বড় সংঘাত নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের সঙ্গে যৌথভাবে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী সুওয়ালকি গ্যাপের কাছে সামরিক মহড়া চালানো হয়েছে। লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে ন্যাটোর বাকি সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত করা এই করিডরকে জোটটির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
একই সময়ে ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদারের পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রাশিয়ার কথিত ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশের ওপর ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে।
যুক্তরাজ্যও নাগরিকদের সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান বর্তমান সময়কে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়গুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জার্মানি সম্ভাব্য রুশ হামলার কথা মাথায় রেখে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। সুইজারল্যান্ডও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে।
‘গ্রে জোন’ কৌশল নিয়ে উদ্বেগ
ইউরোপীয় দেশগুলো কয়েক বছর ধরে সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, ড্রোন কার্যক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে আসছে। এসব কর্মকাণ্ডকে অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর অঞ্চলের কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ ধরনের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে দায় অস্বীকারের সুযোগ থাকায় ন্যাটোর প্রতিক্রিয়াও জটিল হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সীমারেখা ব্যবহার করে রাশিয়া জোটের প্রতিক্রিয়া ও ঐক্য যাচাই করার সুযোগ পেতে পারে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থান ও অস্বীকৃতির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সুওয়ালকি গ্যাপ কেন গুরুত্বপূর্ণ
পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী প্রায় ৬৫ মাইল দীর্ঘ সুওয়ালকি গ্যাপই বাল্টিক ন্যাটো সদস্যদের জোটের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা প্রধান স্থলপথ। ফলে কোনো সংকটের সময় এই অঞ্চল ঘিরে সামরিক চাপ তৈরি হলে বাল্টিক দেশগুলোর সঙ্গে ন্যাটোর স্থল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, জোট এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত সামরিক মহড়া চালায়। তবে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে ন্যাটোর ৩২ সদস্য কীভাবে এবং কত দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
ইউক্রেন থেকে শিক্ষা
ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের দেশগুলোকে দেখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু সামরিক সরঞ্জাম থাকলেই যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্য ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতেও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চালু রাখার সক্ষমতা প্রয়োজন।
এ কারণেই ন্যাটো জাতীয় পর্যায়ে ‘রেজিলিয়েন্স’ বা সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ইউক্রেন কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী রুশ হামলার মধ্যেও জরুরি পরিষেবা সচল রেখেছে, সেটিও জোটের দেশগুলো বিশ্লেষণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
ইউরোপের উদ্বেগের আরেকটি বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিশ্রুতি। একই সময়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থ জড়িত থাকায় বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদ ও সক্ষমতা বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়েও ইউরোপে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া যদি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের পরিবর্তে ধাপে ধাপে নাশকতা, সাইবার হামলা, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সীমিত সামরিক পদক্ষেপ নেয়, সেক্ষেত্রে জোটের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে—এ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
শীতল যুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় ইউরোপের অনেক দেশ যুদ্ধের সম্ভাবনাকে তুলনামূলক দূরের বিষয় হিসেবে দেখেছিল। এখন ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা উত্তেজনার কারণে সেই অবস্থান বদলাচ্ছে। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো দেখাচ্ছে, ইউরোপীয় দেশগুলো সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকিকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ