
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী করতে সিলেবাস ও কর্মপদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন। সরকারের ঘোষিত কর্মসূচি ও নীতিমালার আলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে তাদের শিক্ষাক্রম ও কার্যপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তনের কাজ শুরু করেছে।
শনিবার রাজধানীর নভোথিয়েটারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর প্লিনারি সেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত বাংলাদেশের জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম): উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড নির্মাণ’ শীর্ষক সেশনে শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।
ড. মাহ্দী আমিন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও যদি একইভাবে শিক্ষা ও কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে, তাহলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব। বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান নীতিগত দূরত্ব কমানো জরুরি। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ শক্তিশালী করা গেলে দেশেই কর্মসংস্থানমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে এপ্রেন্টিসশিপ ও ইন্টার্নশিপের মধ্যকার ব্যবধান দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য সমন্বিত ‘এসটিইএম ক্যারিয়ার গাইডেন্স’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আধুনিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘ইন্ডাস্ট্রি-ফিট সার্টিফিকেট’ চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিলের একটি অংশ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তাঁর মতে, এতে একদিকে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়বে, অন্যদিকে সময়োপযোগী গবেষণার ক্ষেত্রেও গতি আসবে।
এসটিইএম শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনও আশাব্যঞ্জক নয়। তাই নারী শিক্ষার্থী ও উদ্যোক্তাদের এ খাতে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা ও সহায়তার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল পরিসরের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৭ লাখ গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে বের হন। ফলে দেশের দক্ষ ও কর্মসংস্থানমুখী জনশক্তি তৈরিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকাঠামোয় দ্রুত বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
এ জন্য অধিভুক্ত কলেজগুলোতে আধুনিক ল্যাবরেটরি, কম্পিউটার সুবিধা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে এবং ইউনিসেফের সহায়তায় এ বিষয়ে একটি জাতীয় পর্যায়ের জরিপও চলছে। জরিপের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত তিন দিনের বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ১০টি উদ্ভাবন প্রদর্শন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা এসব উদ্ভাবন নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেবাসে প্রযুক্তি, গবেষণা, ব্যবহারিক দক্ষতা ও শিল্পের প্রয়োজনীয়তা যুক্ত করা গেলে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে উদ্ভাবন ও গবেষণার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি