
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চলমান সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের নীতিগত সিদ্ধান্ত, অস্বচ্ছ চুক্তি, অতিরিক্ত ব্যয়, আমদানি-নির্ভরতা এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে এ সংকট ক্রমে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বা উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর বদলে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন জ্বালানিবিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম।
তার মতে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও বিনিয়োগকারীর মুনাফা নিশ্চিত করে তার ঝুঁকি রাষ্ট্র বা ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়। একটি সুস্থ বিনিয়োগব্যবস্থায় ঝুঁকি, সেবার মান, দক্ষতা ও মুনাফার মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্ক থাকতে হবে।
প্রয়োজনীয় ও দক্ষ ব্যয়ের তুলনায় প্রকৃত ব্যয় এবং মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হলে সেটিকে লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ ধরনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সংকট শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানির নয়
বাংলাদেশে গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অস্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, অসম শর্ত এবং দায়মুক্তির আইনি ব্যবস্থার কারণে জবাবদিহি ও দক্ষতার সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ।
এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য, সরকারি ভর্তুকি এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। একই সময়ে প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। ফলে একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে ভোক্তার ওপর বাড়ছে ব্যয়ের চাপ।
এ কারণে বর্তমান সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানির ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামর্থ্যের সংকট।
উৎপাদনক্ষমতা বাড়ালেই কি ব্যয় কমবে?
সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা উন্নয়নে ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া খুলনা ও বরিশালে নতুন এলএনজি টার্মিনাল, ভোলায় ৪০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মাতারবাড়ী ও পায়রায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
একই সঙ্গে ২০ শতাংশ স্টোরেজ সক্ষমতাসহ ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, ৪ হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ এবং আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকে গ্রিড বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিস্থাপনের কথাও পরিকল্পনায় রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো আর সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। উৎপাদনক্ষমতার ব্যয়, ব্যবহার, জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থায়নের কাঠামো বিবেচনা না করলে নতুন বিনিয়োগই ভবিষ্যতে বড় আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।
ব্যয় কমাতে ক্যাবের ১২ প্রস্তাব
এই সামর্থ্যসংকট মোকাবিলায় কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) পাঁচ বছরের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে।
সরকারি সেবায় মুনাফা বন্ধ
সরকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবাকে মুনাফা ও লুণ্ঠনমুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই অর্থ সাশ্রয় হলে বিদ্যুৎ খাতকে ভর্তুকিমুক্ত করা, মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো এবং সরকারের বকেয়া ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
এলএনজি আমদানি সীমিত করা
বিদ্যমান সক্ষমতা অনুযায়ী বছরে ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডির বেশি এলএনজি আমদানি না করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে বাপেক্সের মাধ্যমে ছাতক (পূর্ব) গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাব্য গ্যাস উত্তোলন এবং পুরোনো কূপ সংস্কারের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৬ টাকা মূল্যহারের বিদ্যুৎ জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
তরল জ্বালানির বিদ্যুৎ কমানো
তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে বছরে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এর পরিবর্তে তুলনামূলক কম ব্যয়ের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো
কয়লা আমদানি বাড়িয়ে ৯০ শতাংশের বেশি প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে প্রায় ৭ টাকা ৫০ পয়সা মূল্যহারে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রতিস্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ
১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে গ্রিড বিদ্যুতের চাহিদা ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
এ ছাড়া অনধিক ৬ টাকা বেঞ্চমার্ক মূল্যহারে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টসহ ইউটিলিটি স্কেলে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুতের বেঞ্চমার্ক মূল্যহার অনধিক ৬ টাকা ৪৮ পয়সা রাখার কথা বলা হয়েছে।
ভোলায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ
ভোক্তার অর্থে গঠিত বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল ব্যবহার করে ভোলায় পিডিবির মালিকানায় স্বল্প ব্যয়ে ৪০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো
জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ বাড়িয়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বছরে গড়ে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মূল্যহার কমানো
রাজস্ব ছাড় সমন্বয়ের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মূল্যহার ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের লেভেলাইজড উৎপাদন ব্যয়হার ৩ টাকা ৮৯ পয়সা। এক মার্কিন ডলারের মূল্য ১২৩ টাকা ধরে ভারতে এই হার ৩ টাকা ৮৮ পয়সা এবং পাকিস্তানে ৩ টাকা ৯২ পয়সা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদানির বিদ্যুতের মূল্য পুনর্বিবেচনা
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশের আলোকে আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের মূল্যহার কমিয়ে ভারত থেকে সরকারি পর্যায়ে আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এটি সম্ভব না হলে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনার কথাও বলা হয়েছে।
বছরে ৫২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্য
ক্যাবের প্রস্তাবগুলোর মূল লক্ষ্য বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৭ টাকা ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
ব্যয় কমানো গেলে একই সঙ্গে ভর্তুকি, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ, আমদানি-নির্ভরতা এবং সরকারের আর্থিক চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে।
প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং কত কম ব্যয়ে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে এবং কার স্বার্থে সেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তাই নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যয়ের অপচয় ও অযৌক্তিকতা দূর করা, আমদানি-নির্ভরতা কমানো, দেশীয় জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। কারণ জবাবদিহি ছাড়া শুধু নতুন নীতি বা নতুন প্রকল্প দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত এই খাতের সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—নতুন ব্যয় বাড়ানো নয়, বরং বিদ্যমান ব্যয় কমিয়ে জনগণের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি