
দেশে হামে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২ জন। দেশের ইতিহাসে হামে এত বেশি শিশুমৃত্যুর ঘটনা আগে ঘটেনি বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
গত কয়েক বছর ধরে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। এমনকি ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ১৩২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন। এমন পরিস্থিতিতে এ বছর হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
এক দিনে আরও তিন শিশুর মৃত্যু
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়, মঙ্গলবার থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০০ শিশু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯০২ শিশুর।
একই সময়ে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ১১৯ শিশু। এছাড়া নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৬৯ জন। সব মিলিয়ে বুধবার পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ জন।
নজিরবিহীন পরিস্থিতি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এবারের পরিস্থিতিকে দেশের জন্য নজিরবিহীন হিসেবে দেখছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশে এর আগে এত সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা তার জানা নেই। এত বড় প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশুরা।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারীও এবারের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, চলতি বছর বিশ্বে হামে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের ঘটনা বাংলাদেশে হয়েছে।
টিকাদানে ঘাটতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি। একসময় নিয়মিত টিকাদান ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং তা শতভাগ অর্জিত হয়। ২০১০ সালের ফলোআপ ক্যাম্পেইনেও ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা হয়েছিল।
২০১৪ সালের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতেও ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এবং কাভারেজ শতভাগের বেশি ছিল।
নিয়মিত টিকাদানের হার কমেছে
২০২০–২১ সালের পর বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এই হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।
ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে টিকা সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
গণটিকাদানেও বাদ পড়েছে লাখো শিশু
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকে। মার্চ থেকে পরিস্থিতির অবনতি হলে এপ্রিল থেকে মে মাসে এক মাসব্যাপী গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। তবে ওই কর্মসূচিতেও প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।
এপ্রিল মাসে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও পরে দেখা যায়, এ বয়সী প্রায় ৪৬ লাখ শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
এখনই বড় পরিসরে টিকাদানের আহ্বান
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, টিকাদান কর্মসূচির পরও এত বড় আকারে হাম সংক্রমণ ও মৃত্যু অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত টিকাদানের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তার মতে, ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি পূরণ এবং বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা জরুরি।
দেশে হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা এবং সর্বোপরি টিকাদানের কাভারেজ বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি