
হানাহানি ও সংঘাত এড়িয়ে আলাপ-আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রোববার বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় মাঠে নাগরিক কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো ধরনের সংঘাত বা রক্তপাত তিনি দেখতে চান না। দেশে সমঝোতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করেন, তাদের সমর্থন করা উচিত। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিভেদ পরিহার করে সবাইকে বাংলাদেশি হিসেবে ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করার আহ্বান জানান তিনি।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, হানাহানি ও সংঘর্ষ নয়, আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও বাস্তবায়নের পথে। এর জন্য জায়গা নির্ধারণের কাজ এগিয়েছে এবং আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভুল্লী ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবির প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি জানান, দুটি এলাকাকেই পৃথক উপজেলা করা হয়েছে এবং সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা দায়িত্ব নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর চালুর বিষয়েও কথা বলেন তিনি। বিমানবন্দর চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুবিধা বাড়বে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এটি টেকসই করতে হলে এলাকায় শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে অর্থ উপদেষ্টা ও বাণিজ্যমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও সফর করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে শিগগিরই বিনিয়োগকারীদের এখানে আনার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চীনের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল। তিনি জানান, চীনা রাষ্ট্রদূত ঠাকুরগাঁও সফর করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ব্যাগ বিতরণ করেছেন। পাশাপাশি কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে চীন সফরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে চীন থেকে বিশেষজ্ঞদের এনে ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করার কথা জানান তিনি।
যুবসমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, চাকরি ও ঠিকাদারির পেছনে না ছুটে তরুণদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে যেখানে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকবে এবং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় সবাই একসঙ্গে কাজ করবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও সফরে যান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পূর্বনির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে দুপুরের দিকে তিনি ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামের হেলিপ্যাডে পৌঁছান। পরে জেলা সার্কিট হাউজে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর সেনুয়া কবরস্থানে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁও শহর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রবেশপথগুলো ব্যানার, ফেস্টুন, তোরণ ও আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। বিকেলে বড় মাঠে জেলার সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আগে হঠাৎ বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া দেখা দিলেও এতে মানুষের উপস্থিতি ও উৎসাহে ভাটা পড়েনি।
সফরকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও অনুষ্ঠানস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।
সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতির।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ