
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নবম জাতীয় পে স্কেল ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপন জারি করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী রোববার নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানিয়েছেন।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করে। নতুন পে স্কেলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়ার কথা নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ এ গ্রেডে মূল বেতন বাড়ছে প্রায় ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হচ্ছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ গ্রেডেও মূল বেতন দ্বিগুণ হচ্ছে।
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীরা একবারে পুরো বর্ধিত বেসিক হাতে পাবেন না। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই তিন ধাপে নতুন বেসিক বাস্তবায়ন করা হবে।
তিন ধাপে বাড়বে বেসিক
১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে বেসিকের বাড়তি অংশের ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ২৫ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ তৃতীয় ধাপে যোগ হবে।
অন্যদিকে প্রথম থেকে নবম গ্রেডে বাড়তি অংশের ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ৩০ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং বাকি ৩০ শতাংশ তৃতীয় ধাপে কার্যকর হবে।
উদাহরণ হিসেবে ২০তম গ্রেডের বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা বেসিক বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। বাড়তি ১১ হাজার ৭৫০ টাকার ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৫ হাজার ৮৭৫ টাকা প্রথম ধাপে যোগ হলে বেসিক দাঁড়াবে ১৪ হাজার ১২৫ টাকা।
দ্বিতীয় ধাপে আরও ২ হাজার ৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা যোগ হয়ে বেসিক হবে ১৭ হাজার ৬২ টাকা ৫০ পয়সা। তৃতীয় ধাপে একই পরিমাণ যোগ হলে চূড়ান্ত বেসিক দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকা।
প্রথম গ্রেডের ক্ষেত্রেও একইভাবে ধাপে ধাপে বেতন বাড়বে। ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়তি ৭৮ হাজার টাকার ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৩১ হাজার ২০০ টাকা প্রথম ধাপে যোগ হয়ে বেসিক হবে ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে তা বেড়ে হবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা এবং তৃতীয় ধাপে চূড়ান্ত বেসিক দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
নবম গ্রেডের বর্তমান ২২ হাজার টাকা বেসিকও বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হবে। তিন ধাপে বেসিক দাঁড়াবে যথাক্রমে ৩০ হাজার ৮০০, ৩৭ হাজার ৪০০ এবং ৪৪ হাজার টাকা।
নতুন ভাতা পেতে অপেক্ষা
চাকরিজীবীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বেসিক তিন ধাপে বাড়লেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা নতুন হারে একসঙ্গে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে পুরো নতুন বেসিক কার্যকর হয়ে গেলেও নতুন ভাতার পূর্ণ সুবিধা পেতে চাকরিজীবীদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী একজন নতুন সরকারি কর্মচারীর মোট মাসিক আয় শুধু বেসিকের ওপর নির্ভর করবে না। কর্মস্থল, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রাপ্য ভাতার ওপর ভিত্তি করে প্রকৃত আয় নির্ধারিত হবে।
যেমন ঢাকায় ২০তম গ্রেডে নতুন যোগ দেওয়া একজন কর্মচারীর বেসিক ২০ হাজার টাকা হলে বিভিন্ন প্রযোজ্য ভাতা যোগ করে মোট মাসিক আয় প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৩তম গ্রেডের একজন নতুন সহকারী শিক্ষকের বেসিক ২৪ হাজার টাকা হলে ভাতাসহ মোট মাসিক আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা হতে পারে। ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার টাকা বেসিক হলে ভাতাসহ আয় ৫০ হাজার টাকার ওপরে যেতে পারে।
নবম গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তার বেসিক হবে ৪৪ হাজার টাকা। ঢাকায় ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে আরও ২২ হাজার টাকা যোগ হলে শুধু বেসিক ও বাড়িভাড়া মিলিয়েই দাঁড়াবে ৬৬ হাজার টাকা। অন্যান্য ভাতা যুক্ত হলে মোট আয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা হতে পারে।
তবে বর্তমানে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে হিসাব কিছুটা ভিন্ন হবে। তাদের বর্তমান বেসিক, ইনক্রিমেন্ট, চাকরির মেয়াদ ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের বাড়তি ব্যয়
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ওপরও বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে। বেতন, ভাতা ও পেনশনসহ নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন কাঠামোর সুবিধার আওতায় আসবেন।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারত। তাই রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে তিন ধাপে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের পক্ষ থেকেও ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়নকে আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় পরিচালন ব্যয় বাড়তে থাকলে উন্নয়ন ব্যয়ে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। তবে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ আর্থিক সুবিধা পেতে বেসিকের ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং নতুন ভাতা কার্যকরের সময়সূচি—দুটিই চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।