‘উপদেষ্টা হয়েও পাথর তোলা বন্ধ রাখতে পারলাম না’ বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ভিন্ন: রিজওয়ানা

ফাইল ছবি
সম্প্রতি নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে সিলেটে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ ‘সাদাপাথর’ এলাকায়। মনোমুগ্ধকর সেই
‘সাদাপাথর’ এলাকাটি এখন প্রায় বিবর্ণ। ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে
পর্যটনকেন্দ্রটি।
এ বিষয়ে গত ২৬ জুলাই বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি তখন বলেন, আগের চার বছর জাফলং-এ পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখতে পেরেছিলাম, এখন আমি উপদেষ্টা হয়েও পারলাম না।
ওই দিন রাজধানীর আগারগাঁও পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত ‘রোড টু গ্রিন মেনিফেস্টো’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। কিন্তু বিষয়টির মূল প্রেক্ষাপট না তুলে ধরে গতকাল ১১ আগস্ট কিছু গণমাধ্যমে ‘উপদেষ্টা হয়েও পাথর তোলা বন্ধ রাখতে পারলাম না’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করা হয়।
বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেছেন, অনুষ্ঠানটি প্রায় ১৭ দিন আগের। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সেখানে বিষয়টি নিয়ে আমি হতাশা প্রকাশ করি। অনুষ্ঠানের পর বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশ পায়। কিন্তু ১৭ দিন পর এখন আবার এই বিষয়ে কিছু গণমাধ্যম গতকাল ১১ আগস্ট খবর প্রকাশ করেছে যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হচ্ছে। তিনি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোকে সংবাদ প্রচারের আগে তথ্য যাচাই ও সাংবাদিকতার নীতিমালা মেনে চলার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, ওই অনুষ্ঠানে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, পাথর উত্তোলনে সর্বদলীয় ঐক্য দেখছি। একটি সুন্দর জিনিস কী করে হাতে ধরে কেমন অসুন্দর করতে হয় সেটা শিখতে হলে বাংলাদেশে আসতে হবে। চোখের সামনে অপূর্ব সুন্দর একটি জায়গা জাফলং চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখলাম। ধ্বংসলীলা দেখলাম।
তিনি বলেন, শুনলাম, এই পাথরগুলো নাকি তুলতেই হবে। কেন তুলতে হবে, কেন? কারও কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই। অথচ পরিসংখ্যান বলছে দেশের চাহিদার মাত্র ৬ ভাগ পূরণ হয় এই পাথরগুলো তুলে। বাকি ৯৪ ভাগই আমদানি করতে হয়। ৯৪ ভাগ আমদানি করতে পারলে বাকি ৬ ভাগ কেন পারলাম না!
তিনি আরও বলেন, কেন আমরা ভিয়েতনামে গিয়ে ওদের নদীর ইকো ট্যুরিজম দেখি, কেন আমরা জাফলং-এ একটা ইকো ট্যুরিজম করতে পারলাম না! আমরা যেমন সৌন্দর্যমণ্ডিত জাফলং দেখেছি, কেন নতুন প্রজন্ম সেই জাফলং দেখতে পারল না! সেখানে আবার রাজনৈতিক ঐক্য দেখলাম।
উপদেষ্টা বলেন, ‘সিলেটে দুজন উপদেষ্টা গেলাম, সেখানে পাথর তুলতে সর্বদলীয় ঐক্য দেখলাম। আগের চার বছর জাফলং-এ পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখতে পেরেছিলাম, এখন আমি উপদেষ্টা, এখন আমি পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে পারলাম না। জাফলং রক্ষা করব বলে কোনো ঐক্য দেখলাম না। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের বাস্তবতা। জাফলংটা ধ্বংস করে দিয়ে কীসের উন্নয়ন, কার উন্নয়ন হচ্ছে? আমরা যদি পাথর না তুলে ইকো ট্যুরিজম করি, হিসাব করে দেখুন পাথর তুলে কত আয় হয় আর ইকো ট্যুরিজম থেকে কত আয় হয়! এই কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস কী কেউ করেছে? একজন ডিসি বলেছিলেন, ইকো ট্যুরিজমে আমরা পাথর তোলা থেকে বেশি আয় করতে পারব। একটা মানুষ সারাদিন পানিতে নেমে পাথর তোলেন, এটাকে আপনার এমপ্লয়মেন্ট বলেন! এটা এক্সপ্লয়েটেশন। এটা একদম ক্লিয়ার কেস অফ এক্সপ্লয়েটেশন।’
ধলাই নদীর উৎসমুখে সীমান্তের জিরো লাইন সংলগ্ন ১০ নম্বর এলাকার নাম ‘সাদাপাথর’। সেই সাদাপাথর এলাকায় প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটকের পদচারণা ঘটে কেবল সৌন্দর্যের টানে। লুটপাটের কারণে মনোমুগ্ধকর সেই ‘সাদাপাথর’ এলাকাটি এখন প্রায় বিবর্ণ।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দাদের অনেকে বলেছেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এখানে দিনে ও রাতে লুটপাট চলেছে। প্রতিরাতে অন্তত শতাধিক গাড়ি পাথর কোম্পানীগঞ্জ থেকে বের হয়ে যেতে দেখেছেন এলাকাবাসী। পাথর লুটের নেতৃত্বে স্থানীয় প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতা জড়িত বলে তাদের অভিযোগ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর