
চলতি বছর ১.৮ মিলিয়ন মুসলিম হজ পালনের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় এই বার্ষিক জমায়েত শুরু হবে ৪ জুন, যা চলবে ৯ জুন পর্যন্ত।
হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ এবং মুসলিমদের জীবনে একবার পালন করা ফরজ একটি ইবাদত। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসলিমরা ইসলামের পবিত্রতম স্থান মক্কায় সমবেত হয়ে এই পবিত্র সফরে অংশগ্রহণ করেন। হজ নিয়ে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।
১. হজ কী?
হজ মানে নির্ধারিত উদ্দেশ্যে যাত্রা করা। এটি ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি—ঈমান, নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ। এটি শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য জীবনে একবার পালন করা আবশ্যক।
২. হজ কবে অনুষ্ঠিত হয়?
হজ পালিত হয় ইসলামি চান্দ্রবর্ষের শেষ মাস জ্বিলহজের ৮ থেকে ১২ বা ১৩ তারিখ পর্যন্ত। ২০২৫ সালে এটি ৪ জুন থেকে ৯ জুন পর্যন্ত হবে। যেহেতু চন্দ্র ক্যালেন্ডার ১০-১২ দিন এগিয়ে চলে, তাই প্রতি বছর হজের তারিখ পরিবর্তিত হয়।
বিশেষ করে এ বছরই শেষবারের মতো হজ মক্কার চরম গরমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পরবর্তী ১৬ বছর এটি ঠাণ্ডা মৌসুমে পড়বে।
৩. মুসলিমরা কেন হজ করেন?
হজ আল্লাহর একটি প্রত্যক্ষ নির্দেশ, যা কুরআনে বারবার বলা হয়েছে। এটি সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে কাবা নির্মাণের মাধ্যমে। পরে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায়ী হজে এটি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।
হজ আত্মার পবিত্রতা ও আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের প্রতীক। এটি কিয়ামতের দিনের স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মুসলিমদের একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে।
৪. হজ কতদিন স্থায়ী হয়?
হজ পাঁচ থেকে ছয় দিন স্থায়ী হয়। এটি শুরু হয় জ্বিলহজের ৮ তারিখে (তরওইয়াহ দিবস), যেখানে হাজিরা মিনায় অবস্থান করেন। এরপর আরাফাত, মুযদালিফা ও মিনায় বিভিন্ন রীতিনীতি পালন শেষে কেউ ১২ তারিখেই বিদায় নেন, কেউ ১৩ তারিখ পর্যন্ত অবস্থান করেন।
৫. হজ ও ওমরাহর পার্থক্য কী?
হজ ফরজ, বছরে নির্দিষ্ট সময়ে পালনযোগ্য। ওমরাহ নফল, সারাবছর যেকোনো সময় পালন করা যায়। হজে মিনায় রাত্রিযাপন, আরাফাতের ময়দানে উপস্থিতি, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ ইত্যাদি রয়েছে; ওমরাহতে কেবল কাবা তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সাঈ অন্তর্ভুক্ত।
৬. হজে কোন কোন রীতিনীতি পালন করা হয়?
প্রথম দিন (৮ জ্বিলহজ): ইহরাম পরিধান, কাবা তাওয়াফ, সাঈ, মিনায় রাতযাপন
দ্বিতীয় দিন (৯ জ্বিলহজ): আরাফাত ময়দানে অবস্থান, মুযদালিফায় রাত যাপন
তৃতীয় দিন (১০ জ্বিলহজ): শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি, চুল কাটানো, ইফাদাহ তাওয়াফ
পরবর্তী দিনগুলো (১১-১৩ জ্বিলহজ): তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, মিনায় অবস্থান
শেষে: বিদায়ী তাওয়াফ
৭. হজের প্রকারভেদ কী কী?
হজ তামাত্তু: ওমরাহ করে ইহরাম মুক্ত হয়ে পরে আবার হজের ইহরাম বাঁধা হয়। এটি সবচেয়ে প্রচলিত।
হজ কিরান: ওমরাহ ও হজ একসাথে ইহরাম অবস্থায় পালন করা হয়।
হজ ইফরাদ: শুধু হজ করা হয়, ওমরাহ নয়। এটি সাধারণত মক্কাবাসীরা করে।
৮. হজে কী নিষিদ্ধ?
ইহরাম অবস্থায় বেশ কিছু কাজ নিষিদ্ধ, যেমন—
যৌন সম্পর্ক
ঝগড়া, গালি-গালাজ
সুগন্ধি ব্যবহার
চুল ও নখ কাটা
পুরুষদের সেলাই করা পোশাক পরা
নারীদের মুখ ঢেকে রাখা ইত্যাদি
ভুলক্রমে এসব করলে সদকা বা কোরবানি দিতে হয়।
৯. হজে কী কী জিনিস সাথে রাখা দরকার?
হজে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো পরিকল্পনা করে গুছিয়ে নিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
হালকা ব্যাগ
হজবিষয়ক বই-পুস্তক
মেডিকেল সামগ্রী
পানি রাখার বোতল
ছাতা
অতিরিক্ত কাপড় ও হালকা খাবার
১০. হজ শেষে মুসলিমরা কীভাবে উদযাপন করেন?
হজের শেষ দিন ১০ জ্বিলহজে পালিত হয় ঈদুল আজহা, যা তিন দিনব্যাপী চলে। দিনটি শুরু হয় ঈদের নামাজ দিয়ে। এরপর কোরবানি দেওয়া হয়, যার গোশত তিনভাগে বিভক্ত করে—নিজের জন্য, আত্মীয়দের জন্য এবং গরিবদের জন্য। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং খুশির পরিবেশে দিনটি উদযাপন করা হয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ