
ভারতের ছত্তীসগড় রাজ্যের বস্তার অঞ্চলে মাওয়াবাদীদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন সামরিক অভিযান চালাচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। কেন্দ্র ও রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার 'অপারেশন জিরো বা কাগার' নামে পরিচিত এই অভিযানের মাধ্যমে বস্তারকে কার্যত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
এই অভিযানে ছত্তীসগড় ও তেলেঙ্গানা সীমান্তবর্তী কারিগট্টা পাহাড়ি জঙ্গলে ইতিমধ্যেই ১০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে ৬৬ হাজারের বেশি নিরাপত্তা কর্মী সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন এই অভিযানে।
সরকারি তথ্যমতে, চলতি বছরেই অন্তত ২০১ জন মাওয়াবাদী নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গত রোববার বস্তারে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে সংগঠনের শীর্ষ নেতা নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজও নিহত হন। গত ১৬ মাসে ছত্তীসগড়ে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪০০। তবে মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, এদের অনেকেই নিরীহ আদিবাসী, যারা ভুয়া সংঘর্ষ বা ‘ফেক এনকাউন্টারে’ নিহত হয়েছেন।
সরকারি হিসেবে ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাওয়াবাদীদের সঙ্গে সংঘাতে অন্তত ১১ হাজার বেসামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। নিহত মাওয়াবাদীর সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ১৬০।
মাওয়াবাদীরা কারা, কী চায় তারা?
ভারতে সশস্ত্র মাওয়াবাদী বিদ্রোহের সূচনা হয় ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি এলাকায়। ভূমিহীন কৃষক ও আদিবাসীদের শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে শুরু হওয়া আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন কানু সান্যাল, চারু মজুমদার ও জঙ্গল সান্তাল। তারা বিশ্বাস করতেন, প্রচলিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
১৯৮০ সালে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ডসহ বিভিন্ন খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চলে। ২০০৪ সালে দুটি প্রধান গোষ্ঠী—পিপলস ওয়ার গ্রুপ এবং মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার—একীভূত হয়ে গঠন করে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওইস্ট)। এই সংগঠন বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় সশস্ত্র মাওয়াবাদী গোষ্ঠী।
‘মাওয়াবাদী মুক্ত ভারত’ ঘোষণা সরকারের
ছত্তীসগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেব সাই জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নেতৃত্বে এই অভিযান একটি 'ফয়সালাকারী পর্ব'। অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছেন, “২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে ভারত সম্পূর্ণ মাওবাদী মুক্ত হবে।”
বস্তারে ৩২০টির মতো স্থায়ী নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং, হেলিকপ্টার ও গোয়েন্দা প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাওয়াবাদীদের গতিবিধি নজরে রাখা হচ্ছে।
অভিযোগ: আদিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে
মানবাধিকার সংগঠন পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (PUCL)-এর দাবি, মাওয়াবাদী দমন অভিযানের নামে সাধারণ আদিবাসীদের হত্যা করা হচ্ছে। গত ১৮ মাসে অন্তত ১১টি ভুয়া সংঘর্ষ চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি। ২০২৪ সালের মার্চে বিজাপুর জেলার বোর্দগা গ্রামে তিনজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনাও এ রকম একটি উদাহরণ।
যদিও পুলিশের দাবি, নিহতরা সক্রিয় মাওয়াবাদী ছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পুলিশ রাতে গ্রামের ১৭ জনকে ধরে নিয়ে যায়, সাতজনকে ছেড়ে দেয়, তিনজনকে গুলি করে হত্যা করে এবং বাকি সাতজনকে আটক করে নিয়ে যায়।
বস্তার অঞ্চলে অতীতে ঘটেছে বহু প্রমাণিত ভুয়া এনকাউন্টার। কিন্তু বিচার হয়েছে মাত্র দুটি ঘটনায়। ২০১২ সালে সারকেগুড়ায় ১৭ জন এবং ২০১৩ সালে এডাসমেটায় ৮ জন আদিবাসীকে হত্যা করা হয়—যাদের বেশিরভাগই শিশু ছিল। বিচারক তদন্তে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হলেও অভিযুক্ত নিরাপত্তা সদস্যদের বিরুদ্ধে আজও কোনো মামলা হয়নি।
পুরনো মাওয়াবাদীদের বাহিনীতে নিয়োগ: বিতর্কিত কৌশল
২০০৮ সাল থেকে ছত্তীসগড় সরকার প্রাক্তন মাওয়াবাদীদের জেলা রিজার্ভ গার্ড (DRG)-এ নিয়োগ দিচ্ছে। তারা জঙ্গলে চলাফেরায় দক্ষ এবং মাওয়াবাদী কৌশল সম্পর্কে ধারণা রাখে বলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে অতীতে এই রকম ‘স্পেশাল পুলিশ অফিসার’ (SPO) নিয়োগ ঘিরে নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
২০০৫ সালে কুখ্যাত ‘সলওয়া জুডুম’ অভিযানের আওতায় গঠিত এসব বাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, খুন, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছিল। ২০১১ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সলওয়া জুডুমকে অবৈধ ঘোষণা করে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পুনর্বাসনের নামে প্রাক্তন মাওয়াবাদীদের আবার অস্ত্র তুলে দিয়ে সহিংসতার চক্রেই ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
শান্তি আলোচনার আহ্বান ও বাস্তবতা
অন্যদিকে, ছত্তীসগড়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজয় শর্মা ঘোষণা দিয়েছেন, “মাওয়াবাদীরা অস্ত্র ত্যাগ করলে সংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সংলাপের দরজা খোলা রয়েছে।” তবে মাওয়াবাদীরা পাল্টা বলছে, সামরিক অভিযান চলতে থাকলে কোনো সংলাপ সম্ভব নয়।
সিপিআই (মাওইস্ট) মুখপাত্র অভয় বলেন, “সরকার নিজেরাই সংবিধানে প্রদত্ত জীবন ধারণের অধিকার লঙ্ঘন করছে। একদিকে সংলাপের প্রস্তাব, অন্যদিকে আদিবাসী হত্যাকাণ্ড—এই দ্বিচারিতা গ্রহণযোগ্য নয়।”
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ