
ফেনীর দাগনভূঞা পৌর শহরে বসুরহাট রোড়স্থ মান্নান ফার্মেসিতে রোগী দেখতেন গ্রাম ডাক্তার আবদুল মান্নান। দীর্ঘ ৪০ বছর অধিক সময় ডিপ্লোমা অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি কোর্স করে রোগী দেখছেন। পরবর্তীতে তিনি হয়ে যান চর্ম রোগীদের অভিজ্ঞ চিকিৎসক। অতিরিক্ত স্টেরয়েড, এন্টিবায়োটিক ও নিয়মের বাহিরে ঔষধ দিচ্ছেন যথারীতি। এমতাবস্থায় রোগীরা না জেনে প্রতিনিয়ত হচ্ছেন প্রতারিত ও সর্বশান্ত। এমন চিকিৎসা নিতে থাকলে অনেকের স্কিন সোরিয়াসিস (ক্যান্সার) হতে পারে বলে আশঙ্কা অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের। প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা অন্ধবিশ্বাসে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতারিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, ১৯৮১ সালে তিনি একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। এ সার্টিফিকেটের ফটোকপি দেখিয়ে একবার জেনারেল ডাক্তার, ভাঙ্গার চিকিৎসক পরবর্তীতে চর্ম রোগীদের চিকিৎসা শুরু করেন। রোগী ও সচেতনমহলের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২১ সালে ভ্রাম্যমাণ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযাণ পরিচালনায় ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করেন। চিকিৎসার নিয়মবহির্ভূত কোন কাজ করবেন না মর্মে অঙ্গিকার দিলেও কোন কিছু তোয়াক্কা না করে অব্যাহত রাখেন চিকিৎসা সেবা। দীর্ঘদিন পর ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ সালে একই অপরাধ প্রমানিত হওয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড ও বাজারে চেম্বার সিলগালা করেন। মুল সনদ না দেখাতে পারায় তিনি টাকার বিনিময়ে নিয়েছেন অবৈধভাবে বিভিন্ন কোর্সের সার্টিফিকেট। এসব সার্টিফিকেট ভূয়া ও জাল জালিয়াতি এবং সরকারি কাজে হয়রানিসহ সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল ইসলামকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি এবং কি সরকারি কাজে বাধাগ্রস্থ করেন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী শাসনামলে ক্ষমতা দেখিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের দিয়ে সুপারিশসহ বহু নাটকের মুল হোতা ৭০বছর বয়সের লেবাসধারী এ চিকিৎসক। এবং কি তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বদলি করবেন বলেও হুমকি প্রদর্শন করেন। প্রায় এক বছর পার হলে তিনি নারায়নগঞ্জের সিভিল সার্জন অফিস কতৃক ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে (২১ দিন প্রশিক্ষণ) গ্রাম ডাক্তার রিপ্রেশার্স কোর্স ২০২২সাল এবং আইডিয়াল ফাস্ট এইড ট্রেনিং সেন্টার থেকে এল এম এ এফ ৬ মাসের সার্টিফিকেট ফেনী সিভিল সার্জন অফিসে জমা দেন।
কিন্ত বিগত ২০২১ সাল ও ২৩ নভেম্বর ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নিকট যে সনদগুলো দিয়েছেন তা সবগুলো নকল ও ভুয়া বলে জানান কতৃপক্ষ। এরপরও ডাক্তার মান্নান নিয়মনীতি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অঙ্গিকারকে কোন রকম তোয়াক্কা না করে বাজারে চেম্বারে না বসে বসুরহাট রোড়স্থ নিজ বাসায় গোপনে তিনশ টাকার ভিজিটে রোগী দেখছেন প্রতিদিন। যেখানে প্রচুর এন্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড টেবলেট, ক্রীম অয়েন্টমেন্ট লিখে প্রেসক্রিপশন করছেন। এ বিষয়ে তিনি লিখিত অঙ্গিকারনামা ও দিয়েছেন এমন অবৈধ প্রাকটিস করবেন না মর্মে। সত্তরোর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তি মানবিক দিক বিবেচনায় আইনগত কঠোর পদক্ষেপ নেননি সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তবে অধ্যবধি পর্যন্ত ফেনী সিভিল সার্জন অফিস ও উপজেলা থেকে কোন প্রকার লিখিত অনুমতি দেননি ডাক্তার মান্নানকে। সেক্ষেত্রে রোগী দেখে প্রেসক্রিপশন দেয়া সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনী।
এভাবে দীর্ঘ তিন যুগের অধিক সময় আয় করেছেন লাখ লাখ টাকা। সিভিল সার্জনকে লিখিত আবেদনে জানান তিনি চার কন্যা সন্তান ও সংসার চালাতে মানবেতর জীবন যাপন করছেন অথচ তার এক মেয়ে আমেরিকা, একজন অস্ট্রেলিয়াসহ তিনি দৈনিক আয় করছেন ৫০/৬০জন রোগী থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা যা মাসিক আয় প্রায় ৪ লাখ টাকার উর্ধ্বে । যে বাসা তৈরি করেছেন তার বর্তমান মুল্য ১০ কোটি টাকার উপরে। সার্টিফিকেট প্রতারনা, নকল সনদ প্রদানে তথ্যর গড়মিল, প্রশাসনকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তসহ সকল বিষয়ে রয়েছে ধোঁকাবাজির নতুন নিয়মকানুন যা একজন চিকিৎসকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আওতায় পড়ে না বলে জানান সচেতনমহল। এছাড়া একজন পল্লী চিকিৎসক কিভাবে এতগুলো (মানবদেহে ক্ষতিকর) ঔষধ লিখেন সেজন্য তার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের জন্য আইনগত পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন ভুক্তভোগী রোগীগন।
আগত নতুন রোগীরা জানান, লোকের মুখে শুনে অনেক দুর থেকে এসেছি, তিনি চর্ম রোগীদের চিকিৎসক। বাসায় রোগী দেখেন ভিজিট আগে ২শ থাকলেও এখন ৩ শ টাকা নিচ্ছেন।
গ্রাম ডাক্তার কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি আবু সাঈদ বোরহান জানান, আমাদের ঔষধ লেখার ক্ষেত্রে অনেক নিয়মকানুন রয়েছে। এন্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড দেয়ার কোন অথরিটি নেই। ডা. মান্নান লিখছেন বলে আমি অবগত হয়েছি। তিনি সমিতির সদস্য হলেও এর দায়ভার সমিতি নিবে না।
গ্রাম ডাক্তার আবদুল মান্নান জানান, তিনি কোন রোগী দেখছেন না। সিভিল সার্জনের কাছে কাগজপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি রিসিভ করেছেন। অথচ তিনি গত ২ মাস যাবত রোগী দেখছেন। দীর্ঘ ৮ মাস কেন সনদ দিতে পারেননি এর জবাবে জানান, তিনি নতুন করে কোর্স সম্পন্ন করেছেন। আবার রিপ্রেশার্স কোর্স করেছেন ২২ সালে সেটিও তখন দেখাতে পারেননি। এজন্য চেম্বার সিলগালা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
সাবেক স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডা তৌহিদুল ইসলাম জানান, তিনি রোগীদের সাথে প্রতারনা করে অবৈধভাবে প্রাকটিস করেছেন। এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। তাকে নিয়মের কথা বলা হলেও তিনি বিগত সরকারের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে রোগী দেখেছেন যা সম্পূর্ণ আইনগত নিষেধাজ্ঞা ছিলো। ২০২৪ সালে নভেম্বর ২৩ তারিখ পর্যন্ত তিনি বৈধ কোন সার্টিফিকেট অফিসে দেখাতে পারেননি। যা দিয়েছিলেন তা যাচাই করে ভুয়া প্রমানিত হয়েছে। এক্ষেত্রে রোগী দেখা আইনগত অপরাধ ও প্রতারনা।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম সোহরাব আল হোসাইন জানান, আবদুল মান্নাকে রোগী দেখার বিষয়ে কোনপ্রকার অনুমতি প্রদান করা হইনি।
ফেনী সিভিল সার্জন ডা. সিহাব উদ্দিন জানান, গ্রাম ডাক্তার আবদুল মান্নান গত ২৬ তারিখ নতুনভাবে সার্টিফিকেট অফিসে জমা দেন। এতে রোগী দেখার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে তিনি রোগী দেখতে পারবেন।
তিনি আরো জানান, বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তার সার্টিফিকেট যাচাই বাছাই করে রোগী দেখার অনুমতি দিতে পারেন অথবা নাও দিতে পারেন। তবে তিনি যে সনদগুলো খতিয়ে ডাক্তার মান্নানকে অনুমতি দিয়েছেন তার কোন লিখিত অনুমতিপত্র বা সনদগুলো দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দেখাতে পারেননি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর