প্রকাশ: শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৪, ৩:০০ পিএম

অনিয়মিত বৃষ্টি আর পোকা মাকড়ের উপদ্রবে অধিকাংশ জমিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন ধানের উৎপাদন। অপরদিকে কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেশি আর কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন কৃষকরা। কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় পরিবারের স্ত্রী সন্তানদের নিয়েই জমির ধান কর্তন করছেন। আবার অধিকাংশ কৃষকরাই বলছেন আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর আমন ধানের ফলন ভাল হলেও ন্যায্য দাম নিয়ে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। কৃষকদের সার বীজ প্রণোদনা দেওয়াসহ মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিতে অফিসারগণ কাজ করে যাচ্ছেন বললেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার পৌর শহরসহ সাত ইউনিয়নেই কম সময়ে আগাম জাতের আমন ধানের ভালো ফলন ও দাম পাওয়ার আশায় রোপা আমনের আবাদ করেছিল এখানকার চাষিরা। ফলন ভাল হওয়ায় ধান কাটা মাড়ায় আর ধান সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার কৃষক। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পাকা ধানে সোনালি রঙের সৌন্দর্যে শোভাবর্ধন করছে অত্র অঞ্চলের ফসলি মাঠ। ইতিমধ্যে উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্প সময়ের উন্নত জাতে ৯৮/৮৯/১৭ ব্রি ধান বীজ রোপণ করায় আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। মাঠ থেকে বাড়ির আঙিনা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষান কৃষাণীরা। শ্রমিক সংকটে জমির পাকা ধান কর্তনে ভোর হতেই জমিতে গিয়ে নিজেরাই ধান কাটছেন। কেউবা ধান কাটছেন আবার কেউবা ধান মাড়াই করছেন। পাশাপাশি ধান শুকানোর কাজেও ব্যস্ত দেখা যায় কৃষাণীদেরও। চলতি বছরে আমন ধানের আবাদ থেকে কর্তন পর্যন্ত বড় ধরনের কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় স্বস্তিতে ধান সংগ্রহ করতে পারায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। কৃষি উপকরণের দাম কমিয়ে চাষাবাদে কৃষকদের আরো উৎসাহিত করা গেল কৃষিতে দেশ স্বনির্ভর হবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। যারা একটু আগে ভাগেই ধান সংগ্রহের কাজ শেষ করতে পেরেছে তাদের অনেকেই গোলায় ধান তুলতে ব্যস্ত।

কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, এ বছর অনিয়মিত বৃষ্টি আর পোকা মাকড়ের কারণে ধানের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। যে জমিতে গত বছরও প্রতি বিঘায় ধান পেয়েছি ২৫ থেকে ৩০ মন সে জমিতে এ বছর পেয়েছি ১২ থেকে ১৫ মন। এ বছর আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কৃষক হৃদয় মিয়া বলেন, উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে আমার ২ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছি। ফলনও ভাল হয়েছে। তবে বাজার ধর নিয়ে চিন্তিত আছি।
কালিকাপ্রসাদ ব্লক সুপার ভাইজার নাসরিন আক্তার বলেন, এ বছর কালিকাপ্রসাদ ব্লকে ১৮০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষাবাদ হয়েছিল। ইতিমধ্যে ৩০ হেক্টর জমির ধান কর্তন হয়েছে। কৃষকরা বলছেন ফলনও ভাল হয়েছে। পোকামাকড়ের উপদ্রবও তেমন একটা ছিল না। ফলন ভাল পেতে জমিতে কখন কোন ধরনের কীট নাশক ব্যবহার করতে হবে সে বিষয়ে আমরা সব সময় কৃষকদের সাথে থেকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে কথা হলে মোখলেছ মিয়াসহ একাধিক কৃষকরা জানান, রোপা আমন ৯৮/৮৯/১৭ ব্রীধান বীজ রোপণ করায় ভাল ফলন পেয়েছি। সারসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন আমাদের খুব একটা পোষায় না। এছাড়া এবছর মনপ্রতি ধানের দামও কমে গেছে ১ থেকে ২শত টাকা। সার বীজসহ সব ধরনের কৃষি উপকরণের ধাম কমালে কৃষকরা লাভবান হতে পারবে। গত বছর যে ধান বিক্রি করেছি ১৫ শত টাকা দরে সে ধান বর্তমান বাজারে ১ হাজার থেকে ১২ শ টাকা। গত বছর ৩৩ শতক জমি থেকে ধান পেয়েছি ১৮ মন। এ বছর ১২ মন ধানও পাবনা। বৃষ্টি আর পোকা মাকড়ের উপদ্রব ক্ষতির কারণ।
হাজি খন্দকার কৃষক বলেন, রাসায়নিক সার ব্যবহার করি। রাসায়নিক সারের দাম অত্যন্ত বেশি। আমাদের পূর্ব পুরুষের আমলে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে আমাদের নিজ হাতে তৈরি জৈব সার ব্যবহার করেছি। বর্তমান সময়ে যান্ত্রিক পদ্ধতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের ফসলেরই উৎপাদন বেড়েছে। তবে কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা খুব একটা লাভবান হতে পারেনা। যতটুকু জানতে পেরেছি সরকারের দেয়া বিনা মূল্যের সার বীজ কিছু সংখ্যক কৃষকরা পেলেও কৃষকদের বড় একটা অংশ এ থেকে বঞ্চিত ।
ভৈরবের কৃষি অফিসার আকলিমা বেগম বলেন, রোপা আমনের ২৩৫০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এ বছর আবাদ হয়েছে প্রায় ২৫শত হেক্টর। নতুন ব্রি-ধান উফশী জাতের বীজ চাষাবাদ করেছিল কৃষকরা। ফলনের উৎপাদন অনেক ভাল হওয়ায় বর্তমান সময়ে রোপা আমন ধানের কর্তন চলছে। মাঠ পর্যায়ে আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ আছে তারা কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শসহ সার্বিক খোঁজ খবর রাখছেন। নতুন উফশী জাতের বীজ রোপণের কারণে কৃষকরা ভাল ফলন পেয়েছেন। আমরা আশা করছি আগামীতে রোপা আমনের আবাদ আরো বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন উফশী জাতের বীজের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর