
ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতুলি এলাকার জেলে সাধু মাঝি। ২২ দিনের মা ইলিশ অভিযান শেষে গত রবিবার দিবাগত রাতে থেকে মাছ ধরার জাল-ট্রলারসহ ৭ জেলে মিলে ভোলার মেঘনা নদীতে মাছ শিকারে যান। ভোর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত নদীতে কয়েক দফা জাল ফেলে সকালে শূন্য হাতে ঘাটে ফিরেন। আশা ছিল নদীতে মাছ শিকার করে সংসারের খরচ জোগানোর পাশাপাশি ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন। কিন্তু নদীতে মাছ না থাকায় সেটি আর হয়ে উঠেনি। বরং উল্টো তিন হাজার টাকা খরচ করে খালি হাতে বাড়ি ফিরে গেছেন। শুধু সাধু মাঝি নয়; ভোলার অধিকাংশ জেলেই অভিযান শেষে নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (০৫নভেম্বর) ভোলা সদর উপজেলার তুলাতুলি, ভোলার খাল, ভাংতির খাল, ইলিশা চডারমাথাসহ বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
তুলাতুলি এলাকার জেলে মো. মনসুর মাঝি জানান, তিনি ছোট ট্রলার নিয়ে ১৩০০ টাকা খরচ করে নদীতে মাছ শিকারে যান। নদীতে জাল ফেলে ৭টি জাটকা ইলিশ পেয়েছেন। ঘাটে এনে সেগুলো ৮০০টাকায় বিক্রি করেছেন। এতে তার ৫০০টাকা লোকসান হয়েছে।
সদর উপজেলার শেখ ফরিদ মাঝি, সাদ্দাম মাঝিসহ ৭-৮জন মাঝি জানান, অভিযান শেষে জেলেরা অনেক আশা নিয়ে নদীতে মাছ শিকারে নেমেছেন। আশা ছিল জালে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ধরা পরবে। আর সেই মাছ বিক্রি করে সংসারের খরচ মিটিয়ে দার-দেনা পরিশোধ করবেন কিন্তু সেটি আর হয়ে ওঠেনি। যে মাছ পেয়েছেন তা বিক্রি করে তেলের খরচও তুলতে পারেননি। বরং উল্টো লোকসান গুনতে হয়েছে।
তারা আরো জানান, অভিযানের আগে নদীতে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেতো সেটিও এখন পাওয়া যায় না।
তুলাতুলি মাছ ঘাটের আড়তদার মো. ইউনুছ ব্যাপারী ও জসিম ব্যাপারী জানান, অভিযানের আগে সেখানে এক দিনে একেকটি আড়তে লক্ষাধিক টাকার মাছ বেচাকেনা হতো, সেখানে অভিযান শেষে মাছ ধরার প্রথম দিনে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মাছ। বেশিরভাগ জেলে নদীতে গিয়ে মাছ বিক্রি করে ট্রলারের তেলের খরচও তুলতে পারেননি। আবার অনেকে ফিরেছেন খালি হাতে।
ভোলা জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভোলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা এক লাখ ৬৮ হাজার। নিবন্ধনে বাইরেও অনেক জেলে রয়েছে। সব মিলিয়ে ভোলায় প্রায় দুই লক্ষাধিক জেলে রয়েছে। এর মধ্যে ২২দিনের অভিযানকালে সময়ে এক লাখ ৪০ হাজার ৯০০ জেলের জন্য ২৫ কেজি করে মোট তিন হাজার ৫২২ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
মৎস্য অফিস সূত্রে আরো জানা গেছে, মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের গত ২২ দিনে ভোলার মেঘান ও তেঁতুলিয়া নদীতে ৬৭৭টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে ৪৩৪ জেলেকে আটক করা হয়েছে। ১৪৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আটক জেলেদের মধ্যে ২৩৪ জেলেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জেলে দেওয়া হয়েছে ৯২ জেলেকে এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় ১০৮ জেলে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২২ দিনের অভিযানে ২১ লাখ ৯৯৩ মিটার জাল, দুই দশমিক ৯৯১ মেট্রিক টন ইলিশ মাছ, ৮৪টি মাছ ধরার ট্রলার ও ৪৩টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ^জিৎ কুমার দেব কালের কণ্ঠকে জানান, এবারের মা ইলিশ রক্ষা অভিযান অন্য বারের তুলনায় অনেকটা সফল হয়েছে। এতে করে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে অভিযান শেষে নদীতে মাছ না পাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, সাধারণত আমবশ্যা ও পূর্ণিমার ওপর ভিত্তি করে নদীতে মাছ কম-বেশি হয়ে থাকে। গত চারদিন আগে আমবশ্যা চলে গেছে। নিয়ম হলো আমবশ্যার চার-পাঁচদিন পর থেকে এক সপ্তাহ নদীতে মাছ তেমন একটা থাকে না। আবার পূর্ণিমার আগ থেকে আবার মাছ পাওয়া যায়। এছাড়াও মা ইলিশ ডিম ছেড়ে সাগরে চলে গেছে। পূর্ণিমার আগে আবার নতুন করে সাগর থেকে মাছ নদীতে উঠে আসবে। তখন জেলের জালে কাঙ্খিত ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছেন এ কর্মকর্তা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর